
ইস্তিগফার ও রিযিকের সম্পর্ক — সূরা নূহের আয়াত ও বাস্তব প্রয়োগ
সূরা নূহে ইস্তিগফারের সাথে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তানের কথা এসেছে। এর প্রকৃত অর্থ কী, কীভাবে ইস্তিগফারকে অভ্যাসে পরিণত করবেন এবং চেষ্টা বাদ দিয়ে ‘অ্যামল’-নির্ভর হয়ে যাওয়ার ভুল থেকে কীভাবে বাঁচবেন — সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ
আমাদের সমাজে একটি কথা খুব প্রচলিত — "রিযিকে বরকত চাইলে বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ো।" কথাটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়, কিন্তু অনেক সময় এটি ভুলভাবে বোঝা হয়। কেউ ভাবেন ইস্তিগফার একটি "মন্ত্র", যা পড়লেই আয় বেড়ে যাবে; কেউ আবার একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন। আসুন কুরআনের আলোকে দেখি, ইস্তিগফার ও রিযিকের সম্পর্ক আসলে কী এবং কীভাবে এর সঠিক প্রয়োগ হতে পারে।
সূরা নূহের আয়াত — প্রেক্ষাপট না বুঝলে অর্থ ভুল হয়
নূহ আলাইহিস সালাম দীর্ঘ সময় ধরে নিজের কওমকে আল্লাহর দিকে ডেকেছেন। সেই দাওয়াতের একটি অংশে তিনি বলেন:
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا — অর্থ: "আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি পাঠাবেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী-নালা সৃষ্টি করবেন।" (সূরা নূহ, ৭১:১০-১২)
এটি নূহ আলাইহিস সালামের নিজ কওমকে দেওয়া আহ্বান। আলেমগণ এখান থেকে এই শিক্ষা নিয়েছেন যে গুনাহ ও অবাধ্যতা মানুষের জীবনে সংকীর্ণতা ডেকে আনতে পারে, আর তওবা ও ইস্তিগফার কল্যাণের দরজা খোলার একটি মাধ্যম। সূরা হূদেও অনুরূপ বক্তব্য আছে: "হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তারপর তাঁর দিকে ফিরে এসো; তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন।" (সূরা হূদ, ১১:৫২)
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষণীয়। আয়াতগুলো একটি কওমের সামষ্টিক অবস্থার কথা বলছে এবং কল্যাণের একটি সাধারণ নীতি তুলে ধরছে। এটি এমন কোনো নিশ্চয়তা নয় যে "আজ এত বার ইস্তিগফার পড়লে আগামী মাসে এত টাকা আসবে।" রিযিকের পরিমাণ ও সময় আল্লাহর হিকমতের অধীন। তাই ইস্তিগফারকে আমরা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার ইবাদত হিসেবে করব — "টাকা আনার মেশিন" হিসেবে নয়।
গুনাহ ও জীবনের সংকীর্ণতা — একটি আত্মজিজ্ঞাসা
ইস্তিগফার শুধু মুখের শব্দ নয়; এর পেছনে থাকে অনুতাপ। আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্ন করা দরকার:
- আমার আয়ে কি সুদ, ঘুষ, ওজনে কম দেওয়া বা পণ্যের দোষ গোপন করার মতো হারাম মিশে আছে?
- কর্মচারীর প্রাপ্য কি ঠিকমতো ও সময়মতো দিচ্ছি?
- যাকাত ও সদাকা কি নিয়মিত আদায় করছি?
- পাওনাদারের ঋণ পরিশোধে অবহেলা করছি কি?
- ফরজ নামাজে অলসতা করছি কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে যদি ঘাটতি পাওয়া যায়, তবে প্রকৃত ইস্তিগফার মানে সেই ঘাটতি ঠিক করার সংকল্প। তওবার শর্ত তিনটি — গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং আর না করার দৃঢ় সংকল্প; আর কারও হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।
ইস্তিগফারের সহজ অভ্যাস
সবচেয়ে সহজ ও প্রচলিত ইস্তিগফার হলো "আসতাগফিরুল্লাহ" (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও প্রতিদিন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় তিনি বলেছেন, "হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো; আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে একশ বার তওবা করি।"
- প্রতিটি ফরজ নামাজের সালামের পর তিনবার "আসতাগফিরুল্লাহ" পড়া সুন্নাহ।
- দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন — যেমন ফজরের পর বা ঘুমের আগে — এবং সংখ্যার চেয়ে নিয়মিততা ও মনোযোগকে গুরুত্ব দিন।
- চলাফেরা, যানবাহনে বা কাজের ফাঁকে মনে মনে ইস্তিগফার করার অভ্যাস করুন।
- কোনো ভুল করে ফেললে দেরি না করে তৎক্ষণাৎ তওবা করুন।
ইস্তিগফারের সাথে চেষ্টা বাদ দেবেন না
অনেকে বিপদে পড়ে সারাদিন তাসবিহ হাতে বসে থাকেন, অথচ দোকান খোলেন না, আবেদন করেন না, খরচের হিসাব রাখেন না। এটি তাওয়াক্কুলের ভুল ব্যাখ্যা। ইস্তিগফার আপনার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করে; কিন্তু জীবিকা অর্জনের জন্য আল্লাহ আমাদের চেষ্টা করার নির্দেশও দিয়েছেন। কুরআনে বলা হয়েছে, "নামাজ শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো।" (সূরা জুমুআ, ৬২:১০) সুতরাং বাজারের খোঁজ, দক্ষতা বৃদ্ধি, হিসাব-নিকাশ, সৎ লেনদেন — এসবের পাশাপাশি ইস্তিগফারকে অভ্যাসে রাখুন।
দুশ্চিন্তা ও অভাবের মুহূর্তে অন্য একটি দোয়া
দুশ্চিন্তা ও আর্থিক চাপের সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া শিখিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ — অর্থ: "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে এবং ঋণের ভার ও মানুষের দমন থেকে।" (সহীহ বুখারী)
লক্ষ করুন, এই দোয়ায় অক্ষমতা ও অলসতা থেকেও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে — অর্থাৎ ইসলাম আমাদের সক্রিয় থাকতেই শেখায়।
আয়ের সমস্যা মানেই আধ্যাত্মিক সমস্যা নয়
বাজারে মন্দা, ব্যবস্থাপনার ভুল, দক্ষতার অভাব, অতিরিক্ত খরচ বা সঞ্চয়ের অভ্যাস না থাকা — এসব বাস্তব কারণেও আয় কমতে পারে। প্রতিটি আর্থিক সংকটকে জাদু, বদনজর বা জিনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বাস্তব কারণ খুঁজে ঠিক করুন, হালাল পথে থাকুন, নিয়মিত ইস্তিগফার ও দোয়া করুন — আর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন। ব্যবসা ও দোকানে ধারাবাহিক ক্ষতি নিয়ে আরও জানতে পড়তে পারেন ব্যবসায় লোকসানের ধারা থেকে মুক্তির জন্য ইসলামি পদক্ষেপ।
শেষ কথা
ইস্তিগফার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক শুদ্ধ করার একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী ইবাদত। রিযিকের পরিমাণ আল্লাহর হাতে — তবে অন্তর পরিশুদ্ধ রাখা, হারাম থেকে বাঁচা, হক আদায় করা এবং সৎভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব। ইস্তিগফারকে জীবিকার "বিকল্প" নয়, বরং চেষ্টার সঙ্গী বানান। আর আর্থিক চাপে মানসিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে পরিবার, আলেম বা প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- বেতন বা পাওনা আটকে থাকলে ধৈর্য, দোয়া ও ন্যায্য পদক্ষেপ — ইসলামি দিকনির্দেশনা
- বেকারত্বের হতাশায় যুবকদের করণীয় — তাওয়াক্কুল ও চেষ্টার সঠিক ভারসাম্য
- হালাল উপার্জনে বরকত বৃদ্ধির নির্দিষ্ট আমল ও দোয়া
- ব্যবসায় লোকসানের ধারা থেকে মুক্তির জন্য ইসলামি পদক্ষেপ
- ওয়াসওয়াসার চিকিৎসায় ধাপে ধাপে অভ্যাস — কী করবেন আর কী করবেন না
- ওসিডি ও ওয়াসওয়াসার পার্থক্য — কখন চিকিৎসা, কখন রুকইয়াহ আর কীভাবে দুটোই একসাথে