
বাচ্চাদের রাতে কান্নার কারণ ও সমাধান
নতুন বাবা-মায়ের রাত কাটে বাচ্চার কান্নার শব্দে টুকরো টুকরো হয়ে — বেশিরভাগ সময়ই এর কারণ একেবারে সাধারণ, তবে ইসলাম নবজাতকের জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষা প্রার্থনাও শিখিয়েছে যা প্রতিটি পরিবারের জানা দরকার।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
রাত একটা, দুইটা, তারপর আবার চারটা — নতুন বাবা-মায়ের ঘুম যেন রাতভর টুকরো টুকরো হয়ে যায় বাচ্চার কান্নার শব্দে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিলেও, যখন কান্না থামানো ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে এবং ক্লান্ত মা-বাবার মনে প্রশ্ন জাগে "এটা কি শুধুই স্বাভাবিক নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে," তখন উদ্বেগ বাড়ে। সত্যি বলতে, নবজাতকের রাতে কান্নার পেছনে প্রায় সবসময়ই একেবারে সাধারণ, ব্যাখ্যাযোগ্য কারণ থাকে — তবে ইসলাম শিশুর সুরক্ষার জন্য কিছু নির্দিষ্ট আমলও শিখিয়েছে, যা প্রতিটি মুসলিম পরিবারেরই জানা উচিত।
স্বাভাবিক কারণসমূহ — যা প্রথমে খতিয়ে দেখবেন
ক্ষুধা সবচেয়ে সাধারণ কারণ, বিশেষত নবজাতকের ক্ষেত্রে যারা প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর খেতে চায়। ভেজা বা নোংরা ডায়াপার, ঘরের অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম অস্বস্তি, দাঁত ওঠার সময়ের ব্যথা, পেটে গ্যাস বা কোলিক (যা সন্ধ্যার দিকে বিশেষভাবে বেড়ে যায় এবং তিন মাস বয়স পর্যন্ত সাধারণ), এবং শুধু ঘুমের স্বাভাবিক প্যাটার্নের অংশ হিসেবে জেগে ওঠা — এগুলোই শিশুর রাতে কান্নার সবচেয়ে সাধারণ ও প্রধান কারণ। প্রতিটি নবজাতকই কমবেশি রাতে জেগে ওঠে ও কাঁদে, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশের অংশ, কোনো ব্যতিক্রম নয়।
ইসলামে সন্তানের সুরক্ষা প্রার্থনার দৃষ্টান্ত
কুরআনে ইমরানের স্ত্রীর একটি দোয়ার উল্লেখ আছে, যা তিনি তার কন্যা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-কে জন্ম দেওয়ার পর করেছিলেন — এই দোয়া প্রতিটি মুসলিম বাবা-মায়ের জন্য এক অসাধারণ উদাহরণ।
وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
উচ্চারণ: ওয়া ইন্নী উ'ঈযুহা- বিকা ওয়া যুররিইয়াতাহা- মিনাশ শাইত্বা-নির রাজীম।
অর্থ: "আর আমি একে (কন্যা সন্তানকে) এবং তার বংশধরদের বিতাড়িত শয়তান থেকে তোমার আশ্রয়ে সঁপে দিলাম।"
সূত্র: সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩৬।
তাফসীরে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, প্রতিটি নবজাতককে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করার চেষ্টা করে, তবে মারইয়াম ও তার পুত্র ঈসা (আলাইহিস সালাম) এই মায়ের দোয়ার বরকতে এই স্পর্শ থেকে সুরক্ষিত ছিলেন (সহীহ বুখারী)। এই থেকেই আলেমরা প্রতিটি নবজাতকের জন্য একই ধরনের সুরক্ষা প্রার্থনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
কখন সামান্য বেশি মনোযোগ দেবেন
যদি কান্না অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয় এবং কোনোভাবেই থামানো না যায় (টানা কয়েক ঘণ্টা), শরীরে ব্যাখ্যাতীত দাগ দেখা যায়, খাওয়া-ওজনে গুরুতর সমস্যা হতে থাকে, জ্বর থাকে, বা নির্দিষ্ট একই সময়ে প্রতি রাতে ঘটতে থাকে — যেমন প্রতি রাতে ঠিক আড়াইটায় — তখন প্রথমে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানো জরুরি। কানের সংক্রমণ, রিফ্লাক্স (পেটের অ্যাসিড উপরে উঠে আসা), দুধে অ্যালার্জি, বা হার্নিয়ার মতো সমস্যা এই ধরনের তীব্র, অস্বাভাবিক কান্নার সাধারণ মেডিকেল কারণ, এবং প্রতিটিই সহজে চিকিৎসাযোগ্য।
প্রতিরোধমূলক সুন্নাহভিত্তিক আমল
ঘুমানোর আগে প্রতিদিন শিশুর কপালে ডান হাত রেখে মু'আউবিযাতাইন পড়ে ফুঁ দিন এবং সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিন। উপরে উল্লিখিত সুরক্ষা দোয়াটি এবং হাসান-হুসাইনের জন্য পড়া দোয়া নিয়মিত পড়ুন। ঘরে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের পরিবেশ রাখুন — মা নিজে তেলাওয়াত করলে তার আওয়াজ শিশুর জন্যও প্রশান্তিদায়ক হয়। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর আগে "বিসমিল্লাহ" বলে কোলে নিন, এবং জন্মের পর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইক্বামত দেওয়ার সুন্নাহ যদি না দেওয়া হয়ে থাকে, তা যত দ্রুত সম্ভব পালন করুন — এটি নবজাতকের প্রথম আধ্যাত্মিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত।
মেডিকেল কারণ বাদ দেওয়ার পরও কান্না চলতে থাকলে
যদি ডাক্তার কোনো শারীরিক কারণ না পান এবং কান্নার প্যাটার্ন অস্বাভাবিক থেকেই যায় — বিশেষত যদি শিশু নির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে ভয় পায় বা রাতের একই সময়ে নিয়মিত জেগে ওঠে — নিয়মিত রুকইয়াহ পানি ব্যবহার করে দেখতে পারেন, সামান্য পানিতে উপরের আয়াত-দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে শিশুকে খাওয়ানো ও শরীরে মুছে দেওয়া। তবে বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধৈর্য, নিয়মিত যত্ন ও সময়ের সাথে সমস্যা আপনাআপনি কমে আসে — এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেরই একটি অংশ, তিন-চার মাস বয়সের পর কোলিকজনিত কান্না নিজে থেকেই কমে যায় বলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান।
নতুন বাবা-মায়ের জন্য একটা বাস্তব কথা
ক্লান্তির মধ্যে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা স্বাভাবিক, এবং নিজেকে দোষারোপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। রাতে পালাক্রমে বাবা-মা দুজনে সামলানোর ব্যবস্থা করুন, সম্ভব হলে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সাহায্য নিন। শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেদের যত্ন নেওয়াটাও সন্তানের যত্নেরই একটি অংশ, কারণ ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত বাবা-মা সন্তানকে সেরা যত্ন দিতে পারেন না।
মনে রাখবেন, নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, কোনো তাবিজ বা শিরকি আমলের প্রয়োজন নেই, শুধু কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক আমলই যথেষ্ট। উদ্বেগ দীর্ঘস্থায়ী হলে ডাক্তারের পাশাপাশি আমাদের সাথেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ নিতে পারেন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- জিনের আছর নাকি মৃগীরোগ? পার্থক্য বোঝার বাস্তব উপায়
- রাতে বাথরুমে জিনের সংস্পর্শের ঝুঁকি ও সুরক্ষার আমল
- জিনের আছরে কণ্ঠস্বর বা আচরণ বদলে যাওয়ার লক্ষণ কীভাবে চিনবেন
- ভাড়া বাসায় আগের ভাড়াটিয়ার রেখে যাওয়া জিন সমস্যা— করণীয় কী
- জিনের আছরে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা: কারণ, লক্ষণ ও করণীয়
- রুকইয়াহর সময় বারবার হাই তোলা: এর প্রকৃত ব্যাখ্যা কী