
ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে বদনজর থেকে কৃষকের সতর্কতা ও করণীয়
গোলাভরা ধান, বাম্পার ফলনের গল্প যখন গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই শুরু হয় বদনজরের ঝুঁকি। ফসল কাটা ও গোলাজাত করার সময় কৃষকের জন্য ইসলামি সতর্কতা ও প্রতিকার।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
এবার আমন ধানের ফলন হয়েছে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। করিম মিয়ার তিন বিঘা জমির ধান কাটার পর গোলা উপচে পড়ছে, বাড়ির উঠানে ধানের স্তূপ দেখে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই এসে দেখে যাচ্ছে, প্রশংসা করছে। কিন্তু গোলাজাত করার এক সপ্তাহের মধ্যেই ধানে পোকা ধরল, একটি অংশ ভিজে নষ্ট হয়ে গেল অথচ বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনাই ছিল না সেদিন। পাশের ক্ষেতের ফসল অক্ষত থাকলেও করিম মিয়ার গোলার ধানেই যেন কোনো এক অদৃশ্য আপদ লেগেছে। গ্রামের প্রবীণরা মাথা নেড়ে বলেন, "এত মানুষ দেখে গেল, নজর তো লাগবেই।"
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর সমাজে এই ধরনের অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। ফসল কাটার মৌসুমে, বিশেষত যখন ফলন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়, তখন গোলাজাত ফসল, কাটা ধানের স্তূপ, পাটের গাদা বা সবজির ভালো ফলন নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আলোচনা ও মুগ্ধতা তৈরি হয়, তার সাথে বদনজরের একটি সম্পর্ক ইসলামি দৃষ্টিতেও স্বীকৃত। প্রশ্ন হলো, এই সম্পর্ক কতটা বাস্তব, আর কৃষক পরিবারের জন্য করণীয় কী।
কুরআনের আলোকে অতিরিক্ত মুগ্ধতা ও দৃষ্টির প্রভাব
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-কালামে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাসীদের ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে —
"আর কাফেররা যখন কুরআন শোনে, তখন তাদের দৃষ্টি দিয়ে যেন তোমাকে আছড়ে ফেলতে চায়, আর তারা বলে, নিশ্চয় সে তো এক পাগল।" (সূরা আল-কালাম, আয়াত ৫১)
মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, এখানে "দৃষ্টি দিয়ে আছড়ে ফেলা" বাক্যাংশটি বদনজরের শক্তিকে ইঙ্গিত করে — এতটাই তীব্র ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি হতে পারে যে তা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে। ইবনু কাসীর (রহঃ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার একটি কারণ ছিল, কিছু অবিশ্বাসী নবীজির প্রতি তাদের তীব্র ঈর্ষার কারণে দৃষ্টি দিয়ে ক্ষতি করার চেষ্টা করত। এখান থেকেই আলেমগণ বদনজরের বাস্তবতা এবং এর সম্ভাব্য তীব্রতা সম্পর্কে দলিল গ্রহণ করেন।
এই আয়াতের শিক্ষা ফসলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রাচুর্য, সাফল্য বা সৌন্দর্য যখন প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয় এবং তা মানুষের মধ্যে তীব্র বিস্ময় বা ঈর্ষার জন্ম দেয়, তখন আল্লাহর অনুমতিক্রমে সেই বস্তুর ক্ষতি হতে পারে — এটাই বদনজরের মূলনীতি, যা ফসল, পশু, সম্পদ বা মানুষ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
কেন ফসল কাটার মৌসুম বেশি ঝুঁকিপূর্ণ
ফসল কাটার সময়টা এমনিতেই একটা সামাজিক জমায়েতের মৌসুম। ক্ষেতে দিনমজুর কাজ করে, প্রতিবেশীরা দেখতে আসে, আত্মীয়স্বজন খবর নেয় ফলন কেমন হলো। এই সময় ফসলের পরিমাণ, মান ও দাম নিয়ে ঘন ঘন আলোচনা হয় — কার ফলন কত ভালো হলো, কে এবার লাভবান হলো, কার ফসল সবচেয়ে সুন্দর — এই তুলনামূলক আলোচনাই ঈর্ষা ও মুগ্ধতার একটি উর্বর পরিবেশ তৈরি করে। যে কৃষকের ফলন প্রতিবেশীদের তুলনায় সবচেয়ে ভালো হয়, সে-ই স্বাভাবিকভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে থাকে, এবং সেই কারণেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতেও থাকে।
গোলাজাত করার সময়ের বিশেষ সতর্কতা
ফসল মাঠে থাকা অবস্থায় যতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তার চেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফসল কাটার পর গোলাজাত করার সময়। কারণ তখন পুরো ফলনের পরিমাণ একসাথে চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় — গোলা ভরে যাওয়া, উঠানে ধানের স্তূপ, গোয়ালঘরে পাটের গাদা। এই দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা বা ঈর্ষা তৈরি করে, কারণ একসাথে এত বেশি প্রাচুর্য দেখার সুযোগ অন্য সময় হয় না। এই কারণে আলেমগণ পরামর্শ দেন, গোলাজাত করার সময় অহেতুক জাঁকজমক এড়িয়ে চলা এবং সম্ভব হলে ফলনের সঠিক পরিমাণ প্রকাশ্যে ঘোষণা না করা।
বদনজরজনিত ফসলের ক্ষতির লক্ষণ
- কোনো সুস্পষ্ট আবহাওয়াগত বা জীবাণুঘটিত কারণ ছাড়াই হঠাৎ ফসলে পোকা বা ছত্রাক আক্রমণ শুরু হওয়া, বিশেষত মানুষ দেখে যাওয়ার পরপরই।
- একই জমির বা একই গোলার ফসল বারবার নষ্ট হওয়া, অথচ পাশের জমি বা গোলা অক্ষত থাকা।
- গোলাজাত করার পরপরই অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত পচন বা ওজন কমে যাওয়া, যদিও সংরক্ষণ পদ্ধতি সঠিক ছিল।
- ফসল বিক্রির সময় হঠাৎ দরপতন বা ক্রেতা হারিয়ে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক ঘটনা।
- একই কৃষকের বারবার, প্রতি মৌসুমেই ভালো ফলনের পরপরই কোনো না কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে প্রথমেই কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বা অভিজ্ঞ কৃষিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ পোকামাকড়, ছত্রাক বা সংরক্ষণজনিত সমস্যার প্রকৃত চিকিৎসাগত সমাধান থাকতে পারে। বদনজরের সন্দেহ থাকলেও কৃষিবিজ্ঞানের পরামর্শ উপেক্ষা করা উচিত নয়।
প্রতিরোধে ইসলামি শিষ্টাচার ও আমল
ফসল কাটা ও গোলাজাত করার সময় কিছু ইসলামি শিষ্টাচার মেনে চললে বদনজরের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নির্দিষ্ট করণীয়
- ফসল কাটা শুরুর আগে "বিসমিল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহ" বলে কাজ শুরু করা, এবং ফলন ভালো হলে তা প্রকাশ্যে জাঁকজমকের সাথে প্রচার না করে নিভৃতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
- কেউ ফসল দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করলে সাথে সাথে তাকে বলতে উৎসাহ দেওয়া "মাশাআল্লাহ, লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই) — এই দোয়া বদনজরের প্রভাব প্রতিরোধে বিশেষভাবে কার্যকর বলে হাদিসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
- গোলাজাত করার আগে গোলাঘরে বা ধানের স্তূপের চারপাশে পানি ছিটিয়ে দেওয়া, যে পানিতে আয়াতুল কুরসি, তিন কুল এবং সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দেওয়া হয়েছে।
- প্রতি মৌসুমে ফসল কাটার পর সাদাকা বা গরিব-দুঃখীদের মধ্যে ফসলের একটি অংশ বণ্টন করে দেওয়া, যা শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ করে না, বরং নিয়ামতের ওপর বরকত বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবেও ইসলামি শিক্ষায় বিবেচিত হয়।
- নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার আযকার এবং জমি ও গোলাঘরে যাওয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পাঠের অভ্যাস রাখা।
এই আমলগুলো কোনো জাদু-টোনা বা তদবির শাস্ত্রের চর্চা নয়, বরং সরাসরি কুরআন ও নবীজির শেখানো দোয়া থেকে নেওয়া, যা যেকোনো মুসলিম নিজে বাড়িতে বসেই করতে পারেন।
বারবার লোকসান হলে কী করবেন
যদি ইতিমধ্যে সন্দেহ হয় ফসলে বদনজর লেগেছে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে দ্রুত পৃথক করে ফেলা, বাকি ফসল রক্ষার জন্য উপরে উল্লেখিত পানি ছিটানোর আমল করা এবং নিয়মিত সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা যেতে পারে। পাশাপাশি জমিতে বা গোলাঘরে গিয়ে নিয়মিত জিকির করার অভ্যাস রাখলে মানসিক প্রশান্তিও বৃদ্ধি পায়, যা কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও উন্নত করে। মনে রাখতে হবে, বদনজরের প্রতিকার কখনোই কৃষিবিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি — যেমন সঠিক সংরক্ষণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক প্রয়োগ — এসবের বিকল্প নয়।
কতদিনে সমাধান পাওয়া যাবে
নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিয়ে বলা সম্ভব নয় কখন ফসলের ক্ষতি থেমে যাবে বা কখন পরবর্তী মৌসুমে ভালো ফলন হবে। নিরাময় ও বরকত একমাত্র আল্লাহর হাতে; কৃষকের দায়িত্ব হলো যথাসাধ্য কৃষিবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা, ইসলামি শিষ্টাচার মেনে চলা এবং ধৈর্য সহকারে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। কোনো এক মৌসুমে ভালো ফল না পেলেও হতাশ না হয়ে পরের মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই কৃষকসুলভ মানসিকতা।
শেষ কথা
ফসল একজন কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল, তাই তা নষ্ট হয়ে গেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া স্বাভাবিক। বদনজরের বাস্তবতাকে ইসলাম অস্বীকার করে না, তবে প্রতিটি ক্ষতির পেছনে বদনজর খোঁজার আগে কৃষিবৈজ্ঞানিক কারণ যাচাই করাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রাচুর্য প্রকাশে সংযম, আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, বরকতের দোয়া এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমল — এই কয়েকটি বিষয় নিয়মিত মেনে চললে কৃষক পরিবার অনেকটাই নিরাপদ থাকতে পারে। কোনো তাবিজ, পাল্টা জাদু বা তদবির শাস্ত্রের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু আন্তরিক বিশ্বাস ও নিয়মিত আমল।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- হঠাৎ সুস্থ পোষা প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়লে বদনজরের ভূমিকা ও করণীয়
- বদনজরে আক্রান্ত হলে ঘুমের সমস্যা ও দুঃস্বপ্ন — লক্ষণ চেনা ও প্রতিকার
- আত্মীয়-স্বজনের হিংসাত্মক নজর থেকে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার উপায়
- বিয়ের কনে-বরকে বদনজর থেকে সুরক্ষার আমল ও করণীয়
- নতুন করে ঘর সাজানোর পর বদনজরের ঝুঁকি ও করণীয়
- পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে-পরে বদনজর থেকে সুরক্ষা
https://alshifa.bd/blog/harvest-season-crop-storage-evil-eye