
নতুন করে ঘর সাজানোর পর বদনজরের ঝুঁকি ও করণীয়
নতুন ফ্ল্যাট বা বাড়ি সাজানোর পর ইলেকট্রনিক জিনিস বারবার নষ্ট হওয়া, ঘরে অশান্তি বা অস্বস্তি বদনজরের ইঙ্গিত হতে পারে কিনা এবং সূরা বাকারা তেলাওয়াতসহ ঘরে বরকত ধরে রাখার আমল বিস্তারিত জানুন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
মাসের পর মাস জমানো টাকায় অবশেষে বসার ঘরটা মনের মতো করে সাজানো হয়েছে — নতুন সোফা, ভারী পর্দা, শোকেসে সাজিয়ে রাখা বছরের পর বছরের শখের জিনিসপত্র। উদ্বোধনের দিন আত্মীয়-প্রতিবেশীরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন, প্রশংসা করছেন, ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে দিচ্ছেন। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই লক্ষ করা গেল, নতুন কেনা ফ্রিজ বা এসি বারবার নষ্ট হচ্ছে, যে ঘরটা সবচেয়ে যত্ন করে সাজানো হয়েছিল সেখানেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অকারণ ঝগড়া লেগে থাকছে, এমনকি ঘরে ঢুকলেই একটা অস্বস্তি কাজ করছে। পরিবারের মুরুব্বিরা তখন প্রশ্ন তোলেন — এত মানুষ দেখল, নজর লেগে গেল না তো?
ঘর সাজানোর পর বদনজর কেন বিশেষভাবে আলোচিত
ইসলামি ইতিহাসে সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনজনিত বদনজরের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় নবী ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ঘটনায়। মিসরে প্রবেশের সময় তিনি তাঁর ছেলেদের একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
"তোমরা সবাই একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করো।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৬৭)
তাফসীরে ইবনে কাসীরসহ অনেক মুফাসসির উল্লেখ করেছেন, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এই নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর ছেলেদের সুঠাম দেহ, সংখ্যা ও সম্মিলিত উপস্থিতির কারণে মানুষের বদনজর লাগার আশঙ্কা থেকে। এখান থেকে বোঝা যায়, নিজের সম্পদ, সৌন্দর্য বা অর্জন একসাথে অনেক মানুষের সামনে প্রকাশ পেলে সতর্কতা নেওয়াটা নবীদেরও সুন্নাহর অংশ — এটা ভীতিকর কুসংস্কার নয়, বরং একটা বাস্তবসম্মত প্রজ্ঞা।
ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি কীভাবে বাড়ে
নতুন সাজানো ঘর দেখতে আসা প্রতিটি মানুষের মনোভাব এক রকম হয় না। কেউ সত্যিকারের আনন্দ থেকে প্রশংসা করেন, কেউ আবার নিজের অভাব বা তুলনার বোধ থেকে ভেতরে ভেতরে ঈর্ষান্বিত হন — বিশেষ করে যিনি নিজে আর্থিক সংকটে আছেন বা একই রকম ঘর সাজানোর স্বপ্ন দেখেও তা পূরণ করতে পারছেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন, কারো ভালো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত, নইলে সেই মুগ্ধতাই ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
"তোমাদের কেউ যখন নিজের ভাইয়ের মধ্যে এমন কিছু দেখে যা তাকে মুগ্ধ করে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে।" (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ — সাহল ইবনে হুনাইফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা সম্পর্কিত হাদিস)
এই হাদিসের প্রেক্ষাপট নিজেই তাৎপর্যপূর্ণ। সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-কে গোসলরত অবস্থায় দেখে আমির ইবনে রাবীআহ (রা.) মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, তিনি এত সুন্দর চামড়া কখনো দেখেননি — কিন্তু বরকতের দোয়া না করায় সাহল (রা.) সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখান থেকেই বোঝা যায়, শুধু হিংসুক মানুষ নয়, ভালোবাসা থেকে করা প্রশংসাও বরকতের দোয়া ছাড়া ক্ষতির কারণ হয়ে যেতে পারে।
লক্ষণ যা লক্ষ করা যেতে পারে
- নতুন কেনা ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র বারবার নষ্ট হওয়া, অথচ ব্যবহারে কোনো ত্রুটি নেই
- নির্দিষ্ট একটি ঘর বা কোণায় ঢুকলেই অস্বস্তি, মন খারাপ বা মাথা ভার লাগা
- ঘর সাজানোর পরপরই পরিবারে অস্বাভাবিক পরিমাণে ঝগড়া-বিবাদ বেড়ে যাওয়া
- যেসব শখের জিনিস সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছিল, সেগুলোই আগে ভেঙে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া
- ঘর সাজানোর খরচের পরপরই অপ্রত্যাশিত আর্থিক সংকট তৈরি হওয়া
এখানে মনে রাখা জরুরি, নতুন ইলেকট্রনিক পণ্যে কারিগরি ত্রুটি থাকতে পারে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় লাগতে পারে — তাই প্রতিটা সমস্যাকে বদনজর ভাবার আগে স্বাভাবিক কারণ খতিয়ে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ। একাধিক লক্ষণ একসাথে দেখা দিলে এবং তার পেছনে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেই কেবল বদনজরের সম্ভাবনা বিবেচনায় আনা উচিত।
গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানের সংস্কৃতি ও এর ঝুঁকি
বাংলাদেশে নতুন ফ্ল্যাটে ওঠার পর প্রায় প্রতিটা পরিবারই একটা ছোট বা বড় গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠান করে থাকে — কুরআন খতম, মিলাদ, বা শুধু আত্মীয়স্বজন ডেকে খাওয়ানো। এই অনুষ্ঠানগুলো নিজে থেকে কোনো সমস্যা না, বরং শোকরিয়া প্রকাশের একটা সুন্দর উপায়। ঝুঁকিটা তৈরি হয় তখনই, যখন এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কে কত দামি জিনিস কিনেছে তা প্রদর্শন করা, ধর্মীয় উপলক্ষ্যকে উপলক্ষ্য মাত্র বানিয়ে রাখা। একটা কুরআন খতমের অনুষ্ঠানেও যদি মূল আলোচনা হয়ে দাঁড়ায় সোফার দাম বা পর্দার কাপড়ের ব্র্যান্ড নিয়ে, তাহলে অনুষ্ঠানের বরকতই হারিয়ে যায়। তাই গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠান করলে দোয়া-দরূদ ও কুরআন তেলাওয়াতকে কেন্দ্রে রেখে আয়োজন করাই উত্তম, প্রদর্শনকে না।
করণীয় — ঘরে বরকত ধরে রাখার আমল
নিয়মিত সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াতের অভ্যাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন —
"তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিয়ো না। নিশ্চয় শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াত করা হয়।" (সহীহ মুসলিম)
নতুন সাজানো ঘরে অন্তত সপ্তাহে দুই-তিনবার সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা একটা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা কেবল বদনজর নয়, ঘরে একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতেও সহায়ক।
প্রশংসার সময় ও ঘরে প্রবেশের সময়ের আমল
সূরা আল-কাহফে বর্ণিত সেই বাগানওয়ালার গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘর দেখানোর সময় নিজে থেকেই বলা উচিত এই দোয়াটা।
মা শা আল্লাহু লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ — অর্থ: আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই। (সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৩৯)
এছাড়া নতুন বাসায় ওঠার দিন এবং প্রতিদিন ঘরে প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে শিখিয়েছেন।
বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা — অর্থ: আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামে বের হলাম, এবং আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ওপরই আমরা ভরসা করলাম। (সুনানে আবু দাউদ)
অতিথি আপ্যায়নে সহজ কিছু অভ্যাস
- ঘর দেখানোর সময় নিজে থেকেই বলা — "আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে হয়েছে"
- অতিথিদের কেউ প্রশংসা করলে সঙ্গে সঙ্গে মুখে "মাশাআল্লাহ, বারাকাল্লাহ" বলার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া
- প্রতিদিন ঘুমানোর আগে ঘরের প্রতিটি কোণে সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক্ব ও আন-নাস পড়ে ফুঁ দেওয়ার অভ্যাস — এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের ঘরে করা প্রমাণিত আমল
- ঘরের প্রধান দরজায় প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলে প্রবেশ করার অভ্যাস তৈরি করা
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা — ঘরে নজর আটকানোর নামে বাজারের কোনো তাবিজ, নীল পুঁতি, বা কোনো তদবির-শাস্ত্রের বই থেকে নেওয়া কোনো বস্তু ঝোলানো ইসলামসম্মত নয়। এসব বস্তুর ওপর ভরসা রাখা তাওহীদের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। প্রকৃত সুরক্ষা আসে আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁরই শেখানো দোয়া-যিকির থেকে।
কখন বুঝবেন সমস্যাটা সাধারণ নয়
একটা এসি বা ফ্রিজ একবার নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক প্রযুক্তিগত সমস্যা হতে পারে। কিন্তু একের পর এক জিনিস অস্বাভাবিক হারে নষ্ট হতে থাকলে, ঘরে ঢোকা মাত্র পরিবারের সদস্যদের মেজাজ বদলে গেলে, বা কোনো নির্দিষ্ট ঘরে ঘুমাতে গেলেই দুঃস্বপ্ন বা অস্বস্তি হতে থাকলে — এবং এই প্যাটার্ন সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চললে — তখন প্রথমে ইলেকট্রিশিয়ান বা টেকনিশিয়ান দিয়ে ঘরের বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করানো উচিত, কারণ অনেক সময় প্রকৃত কারণ থাকে সাধারণ ওয়্যারিং সমস্যা। প্রযুক্তিগত কারণ বাদ দেওয়ার পরও যদি পরিস্থিতি একই থাকে, তখন একজন যোগ্য রাক্বীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
অনেকে জিজ্ঞেস করেন, নতুন বাসায় ওঠার কতদিনের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে তাকে বদনজরের সাথে যুক্ত করা যায়। এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, তবে সাধারণত প্রথম এক থেকে দুই মাস, যখন সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘর দেখতে আসেন, সেই সময়টাতেই সতর্কতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আরেকটা প্রশ্ন প্রায়ই আসে — নতুন বাসায় ওঠার আগেই কি কোনো সুরক্ষামূলক আমল করা যায়। হ্যাঁ, বাসায় জিনিসপত্র তোলার আগে ঘরে একবার প্রবেশ করে সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াত করে নেওয়া, এবং প্রতিটা কক্ষে বিসমিল্লাহ বলে ঢোকা একটা উত্তম প্রথম পদক্ষেপ।
আল-শিফায় যোগাযোগ
প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসাগত কারণ বাদ দেওয়ার পরও ঘরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলতে থাকলে আল-শিফার ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া যায়। নিয়মিত ফি ৪৯৯ টাকা, জরুরি প্রয়োজনে রাত ৭টা থেকে ১১টার মধ্যে ৯৯৯ টাকায় সিরিয়াল নেওয়া যায়, বাংলা কিউআর কোডে পেমেন্ট করলে যোগাযোগের নম্বর জানিয়ে দেওয়া হয়।
সময় ও প্রত্যাশা নিয়ে বাস্তব কথা
নিয়মিত আমল শুরু করার পর কারো ঘরে দ্রুত পরিবর্তন আসে, কারো ক্ষেত্রে সময় লাগে অনেক বেশি। এখানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া অসম্ভব, কারণ প্রকৃত নিরাময় ও প্রশান্তি আসে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। এই লেখায় বর্ণিত প্রতিটা আমলই কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহর অংশ, কোনো শিরক বা কুফরি প্রথা নয়, এবং কোনো পাল্টা জাদু বা তদবির-শাস্ত্রের অনুশীলন নয়।
একটা ঘরকে সুন্দর করে সাজানো কোনো অন্যায় কাজ নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রকাশ। শুধু সেই নিয়ামত প্রকাশের সময় কৃতজ্ঞতা আর সতর্কতার ভারসাম্য রক্ষা করাই মূল বিষয়। ঘরে অস্বাভাবিক কিছু চলতেই থাকলে এবং নিজে থেকে সামলাতে না পারলে অভিজ্ঞ ও দ্বীনদার কারো সহায়তা নেওয়া দোষের কিছু নয়।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- হঠাৎ সুস্থ পোষা প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়লে বদনজরের ভূমিকা ও করণীয়
- বদনজরে আক্রান্ত হলে ঘুমের সমস্যা ও দুঃস্বপ্ন — লক্ষণ চেনা ও প্রতিকার
- ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে বদনজর থেকে কৃষকের সতর্কতা ও করণীয়
- আত্মীয়-স্বজনের হিংসাত্মক নজর থেকে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার উপায়
- বিয়ের কনে-বরকে বদনজর থেকে সুরক্ষার আমল ও করণীয়
- পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে-পরে বদনজর থেকে সুরক্ষা