
আত্মীয়-স্বজনের হিংসাত্মক নজর থেকে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার উপায়
অপরিচিতের চেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নজর বেশি বিপজ্জনক হতে পারে বলে মনে করেন অনেক আলেম। পারিবারিক অনুষ্ঠানে, ঈদে বা আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে কীভাবে সন্তান ও সংসারকে বদনজর থেকে সুরক্ষিত রাখবেন তা জেনে নিন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
ঈদের দিন বড় বোনের বাড়িতে সবাই একসাথে জড়ো হয়েছে। ছোট চাচাতো বোনের সদ্য হাঁটতে শেখা মেয়েটা সবার মধ্যমণি, সবাই কোলে নিচ্ছে, আদর করছে, প্রশংসা করছে। রাতে বাড়ি ফিরেই বাচ্চাটা প্রচণ্ড কান্নাকাটি শুরু করল, জ্বর এলো, খাওয়া বন্ধ করে দিল। মা চিন্তিত হয়ে ভাবতে লাগলেন, এত মানুষের ভিড়ে কার নজর লেগে গেল। মনে মনে একটা নাম চলেও এলো — বড় জা, যিনি সবসময় একটু অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকান, মুখে প্রশংসা করলেও চোখে যেন অন্য কিছু থাকে।
বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামোয় এই অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। মানুষ সাধারণত ভাবে বদনজর বুঝি বাইরের মানুষ বা অপরিচিতদের কাছ থেকেই আসে, কিন্তু বাস্তবতা এবং ইসলামি শিক্ষা উভয়েই ইঙ্গিত দেয় যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, এমনকি কখনো নিজের ভাইবোন বা চাচা-চাচী, খালা-মামার নজরও সমানভাবে বিপজ্জনক হতে পারে, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি বিপজ্জনক, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে আমাদের জীবন পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাদের অন্তরে হিংসা বা ঈর্ষা জন্ম নেওয়ার সুযোগও বেশি থাকে।
কুরআনের সাক্ষ্য — হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ফালাকে নির্দিষ্টভাবে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন —
"এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।" (সূরা আল-ফালাক, আয়াত ৫)
এই আয়াতে বিশেষভাবে "হিংসা করার" মুহূর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থাৎ হিংসা মনে পোষা এক জিনিস, আর তা সক্রিয়ভাবে প্রকাশ পাওয়া বা কাজ করা আরেক জিনিস। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এই সূরা নাযিল হয়েছিল বিশেষভাবে জাদু ও বদনজরের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা চাওয়ার জন্য, এবং হিংসুকের উল্লেখ এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বদনজরের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর উৎস হয় হিংসা বা তীব্র মুগ্ধতা। আর হিংসা সবচেয়ে বেশি জন্ম নেয় তাদের অন্তরে যারা আমাদের সবচেয়ে কাছের, যারা আমাদের জীবনযাত্রার সাথে নিজেদের তুলনা করার সবচেয়ে বেশি সুযোগ পায়।
কেন আত্মীয়ের নজর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে
এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটু গভীরে যাওয়া দরকার। অপরিচিত কেউ আমাদের সন্তান বা সংসার নিয়ে হয়তো একবার দেখেই মুগ্ধ হয়, কিন্তু তার সাথে তুলনা করার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু ঘনিষ্ঠ আত্মীয় — বিশেষত একই বয়সী ভাইবোন, জা-ননদ, চাচাতো-মামাতো ভাইবোন — তাদের মধ্যে প্রায়ই একধরনের অবচেতন তুলনা চলতে থাকে। কার সন্তান বেশি মেধাবী, কার সংসার বেশি সচ্ছল, কার স্বামী বেশি যত্নশীল, কার বাড়ি বেশি সুন্দর — এই তুলনাগুলো পারিবারিক অনুষ্ঠানে, ঈদ-পার্বণে, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে বারবার সামনে আসে। আর দীর্ঘদিনের এই তুলনা থেকে জন্ম নেওয়া হিংসা কখনো কখনো এতটাই গভীর হয় যে তা বদনজরের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, এমনকি সেই আত্মীয় হয়তো মুখে অত্যন্ত মিষ্টি ব্যবহার করেন এবং নিজেও জানেন না তার অন্তরে এই নেতিবাচক অনুভূতি জমা হচ্ছে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িমের পর্যবেক্ষণ
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বদনজর সবসময় ইচ্ছাকৃত হিংসা থেকে আসে না — অনেক সময় নিকটাত্মীয়ের অজান্তেই, শুধুমাত্র তীব্র মুগ্ধতা বা তুলনার অনুভূতি থেকেও এটি ঘটতে পারে। এই কারণেই ইসলামি শিষ্টাচারে কারো প্রশংসা করার সময় সাথে সাথে বরকতের দোয়া পড়ার এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে অজান্তেও কোনো ক্ষতি না হয়। সুতরাং কোনো আত্মীয়কে সরাসরি দোষারোপ করে "সে-ই নজর দিয়েছে" বলে সম্পর্ক নষ্ট করার প্রয়োজন নেই — বরং সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক আমলের ওপর জোর দেওয়াই উত্তম পন্থা।
পারিবারিক অনুষ্ঠানে যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখবেন
- পারিবারিক অনুষ্ঠান বা আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পরপরই সন্তানের হঠাৎ কান্নাকাটি, জ্বর বা খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া।
- নির্দিষ্ট কোনো আত্মীয়ের সাথে দেখা হওয়ার পরই বারবার একই ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়া, যদিও অন্য সময় এমন হয় না।
- সংসারে হঠাৎ অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অকারণ ঝগড়া বা আর্থিক সংকট শুরু হওয়া, বিশেষত কোনো বড় পারিবারিক অনুষ্ঠানের পরপরই।
- বাড়ির শিশুদের মধ্যে অস্বাভাবিক অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা বা খিটখিটে ভাব, যা আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পরে বেড়ে যায়।
এই লক্ষণগুলো একসাথে ও বারবার দেখা দিলে সতর্ক হওয়া যেতে পারে, তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দোষারোপ করে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করার বদলে সাধারণ প্রতিরোধমূলক আমলের দিকে মনোযোগ দেওয়াই শ্রেয়।
প্রতিরোধে করণীয় শিষ্টাচার
পারিবারিক অনুষ্ঠানে বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার আগে ও পরে কিছু অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
নির্দিষ্ট আমল ও দোয়া
- বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে সন্তান ও নিজেদের জন্য আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পড়ে ফুঁ দেওয়া, এবং ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া "বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ" পড়া।
- ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সন্তানদের জন্য যে দোয়া পড়তেন তা নিয়মিত পাঠ করা — "উয়িযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়ামিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ" (আমি তোমাদের উভয়কে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে প্রতিটি শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রতিটি অনিষ্টকর দৃষ্টি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি) — এটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত এবং সন্তানদের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর একটি সুরক্ষামূলক দোয়া হিসেবে স্বীকৃত।
- অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পর সন্তানকে গোসল করিয়ে দেওয়া বা অন্তত হাত-পা ধুইয়ে দেওয়া, সাথে সাথে রুকইয়াহ পড়া পানি দিয়ে মুখ-হাত মুছে দেওয়া।
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পরিবারের সবার জন্য বরকত ও সুরক্ষার দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তোলা, যাতে অজান্তে সৃষ্ট কোনো নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
নিজের আচরণেও সংযম প্রয়োজন
শুধু অন্যের হিংসা থেকে সুরক্ষা নয়, নিজেকেও অন্যের হিংসার কারণ হওয়া থেকে বিরত রাখা জরুরি। আত্মীয়ের সামনে নিজের সন্তানের সাফল্য, সংসারের সচ্ছলতা বা কোনো অর্জন নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব প্রকাশ করা, তুলনামূলক মন্তব্য করা বা বাড়াবাড়ি রকমের প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইসলাম আমাদের নিয়ামত প্রকাশে বিনয় শেখায় — কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, কিন্তু অহংকারের সাথে নয়। যে পরিবার নিজেদের ভালো অবস্থা নিয়ে যতটা সম্ভব বিনয়ী থাকে, তারা তুলনামূলকভাবে কম ঈর্ষার সম্মুখীন হয়।
সম্পর্ক নষ্ট না করে সমাধান
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার — বদনজরের সন্দেহে কোনো আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করা ইসলামসম্মত নয়। এতে পারিবারিক বন্ধন নষ্ট হয়, যা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় — আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (সিলাতুর রাহিম)। বরং সন্দেহ হলেও ধৈর্য ধরে সম্পর্ক বজায় রাখা, নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য আমল চালিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনে দূরত্ব বজায় রাখা (সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ না করে) — এই মধ্যপন্থাই সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
কখন রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন
যদি সন্তানের বা পরিবারের কোনো সদস্যের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়, ঘরোয়া আমলে উন্নতি না হয়, বা লক্ষণগুলো ক্রমশ তীব্র হতে থাকে, তাহলে একজন যোগ্য ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ অনুশীলনকারী আলেমের সাহায্য নেওয়া উচিত। পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শও অপরিহার্য। রুকইয়াহ কোনোভাবেই চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং তার পরিপূরক একটি আধ্যাত্মিক মাধ্যম।
ধৈর্য ও বাস্তব প্রত্যাশা
কতদিনে সমস্যা সমাধান হবে তার কোনো নিশ্চিত উত্তর কেউ দিতে পারে না। নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, আমাদের কাজ হলো নিয়মিত আমল করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা। এখানে কোনো শিরক বা কুফরি চর্চার সুযোগ নেই — কোনো তাবিজ, পাল্টা জাদু বা তদবির শাস্ত্রের পদ্ধতি নয়, বরং সরাসরি কুরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত আমলই একমাত্র বৈধ পথ।
শেষ কথা
পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত, তাই এই সম্পর্কের মধ্যে বদনজরের মতো কোনো নেতিবাচক প্রভাব থাকার সম্ভাবনা মেনে নেওয়া কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং একই সাথে সম্পর্ক অটুট রাখা — এই দুটো একসাথে চলতে পারে। নিয়মিত দোয়া, বরকতের কালচার এবং প্রদর্শনে সংযম — এই তিনটি অভ্যাসই পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- হঠাৎ সুস্থ পোষা প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়লে বদনজরের ভূমিকা ও করণীয়
- বদনজরে আক্রান্ত হলে ঘুমের সমস্যা ও দুঃস্বপ্ন — লক্ষণ চেনা ও প্রতিকার
- ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে বদনজর থেকে কৃষকের সতর্কতা ও করণীয়
- বিয়ের কনে-বরকে বদনজর থেকে সুরক্ষার আমল ও করণীয়
- নতুন করে ঘর সাজানোর পর বদনজরের ঝুঁকি ও করণীয়
- পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে-পরে বদনজর থেকে সুরক্ষা