ঋতুস্রাব ও হরমোনজনিত সমস্যাকে জিনের আছর মনে করার ভুল

ঋতুস্রাব ও হরমোনজনিত সমস্যাকে জিনের আছর মনে করার ভুল

প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে মেজাজের তীব্র পরিবর্তন, শরীরে ব্যথা বা কান্নাকাটি দেখে অনেক পরিবার একে জিনের আছর ভেবে ভুল করেন। প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে হরমোনের ভূমিকা কতটা, আর কখন সত্যিই রুকইয়াহ প্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে বিস্তারিত।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট সময়ে সুমি আপার মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত — হঠাৎ কান্নাকাটি, তীব্র রাগ, শরীরে অসহ্য ব্যথা, ঘুমাতে না পারা। শাশুড়ি প্রথমে বিষয়টা লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘মাসের এই সময়টায় ওর মধ্যে অন্য কিছু ভর করে।’ পরিবারের কেউ কেউ এটাকে জিনের আছর ভেবে স্থানীয় এক হুজুরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, যিনি তাবিজ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা আগের মতোই থেকে গিয়েছিল, বরং সময়ের সাথে সাথে আরও তীব্র হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা আসলে অস্বাভাবিক নয় — বাংলাদেশের অনেক পরিবারে ঋতুস্রাবজনিত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে ভুলভাবে জিন বা আধ্যাত্মিক সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যা প্রকৃত চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করে।

প্রতিটি অসুস্থতার একটা প্রতিকার আছে — এই মূলনীতি বোঝা জরুরি

সহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন —

مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً
উচ্চারণ: মা আনযালাল্লাহু দাআন ইল্লা আনযালা লাহু শিফাআ।
অর্থ: আল্লাহ যে রোগই পাঠিয়েছেন, তার জন্য একটা প্রতিকারও পাঠিয়েছেন (সহীহ বুখারী)।

এই হাদীসের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, শারীরিক ও হরমোনজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে যাওয়া দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু নয় — বরং এটাই আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার একটা অংশ। ইসলামে রোগের কারণ অনুসন্ধান ও চিকিৎসা গ্রহণকে সবসময় উৎসাহিত করা হয়েছে, আর প্রতিটি অস্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়াকেই আধ্যাত্মিক সমস্যা হিসেবে দেখা এই মূলনীতির পরিপন্থী।

ঋতুস্রাবের সময় হরমোনের প্রভাব বাস্তবেই তীব্র

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ঋতুস্রাবের আগের কয়েকদিন এবং ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রায় বড় ধরনের ওঠানামা হয়, যা মস্তিষ্কের সেরোটোনিন উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। এর ফলে যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে তার মধ্যে আছে —

  • হঠাৎ তীব্র মেজাজ পরিবর্তন, অকারণ কান্না বা রাগ।
  • তলপেটে, কোমরে বা পিঠে তীব্র ব্যথা, কারো কারো ক্ষেত্রে যা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়।
  • প্রচণ্ড ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত এবং কখনো কখনো অস্থিরতা।
  • মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, এমনকি কারো কারো ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
  • কিছু নারীর ক্ষেত্রে তীব্র উদ্বেগ বা এমনকি স্বল্পমেয়াদি বিষণ্নতাসদৃশ অনুভূতি, যাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রি-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (পিএমডিডি) বলা হয়।

এই উপসর্গগুলো সম্পূর্ণভাবে হরমোনের কারণে হওয়া স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া, এর জন্য কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। যেসব নারীর ক্ষেত্রে পিএমডিডি বা অতিরিক্ত তীব্র উপসর্গ থাকে, তাদের জন্য একজন গাইনোকোলজিস্ট বা হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ এর জন্য কার্যকর চিকিৎসাও আছে।

তাহলে কখন সন্দেহ যৌক্তিক হয়ে ওঠে

ঋতুস্রাবের সময় স্বাভাবিক হরমোনজনিত পরিবর্তনের বাইরে গিয়ে যদি এমন কিছু লক্ষণ দেখা যায়, যেগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ ব্যাখ্যায় খাপ খায় না, তখনই আধ্যাত্মিক দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন —

  • ঋতুস্রাব শুরুর অনেক আগে থেকেই কুরআন তেলাওয়াত শুনলে তীব্র শারীরিক প্রতিক্রিয়া, যা সাধারণ হরমোনজনিত মেজাজ পরিবর্তনের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির।
  • শরীরে এমন ব্যথা যা কোনো নির্দিষ্ট ওষুধে কমে না, কিন্তু রুকইয়াহর সময় নির্দিষ্ট আয়াতে তীব্রতর হয়।
  • ঋতুস্রাবের সময় নিজের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যাওয়া বা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করা।
  • দীর্ঘদিন ধরে গাইনোকোলজিক্যাল চিকিৎসা নেওয়ার পরও কোনো উন্নতি না হওয়া, অথচ চিকিৎসকের রিপোর্টে কোনো শারীরিক সমস্যা ধরা না পড়া।

এই ধরনের সম্মিলিত লক্ষণ থাকলেই কেবল আধ্যাত্মিক কারণ বিবেচনায় আনা যুক্তিসঙ্গত, নিছক মেজাজ পরিবর্তন বা ব্যথার কারণে নয়।

বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

কিশোরী মেয়েদের প্রথম কয়েক বছরের ঋতুস্রাব চক্র প্রায়ই অনিয়মিত থাকে এবং হরমোনের ওঠানামা প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের তুলনায় বেশি তীব্র হতে পারে। এই বয়সে হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন, কান্নাকাটি বা রাগ দেখে পরিবার দ্রুত ‘জিনে ধরেছে’ সিদ্ধান্তে পৌঁছালে মেয়েটির মনে নিজের শরীর সম্পর্কে একধরনের ভীতি ও লজ্জা তৈরি হতে পারে, যা তার দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই বয়সে মায়েদের উচিত মেয়েকে শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রস্তুত করা, যাতে সে নিজের শরীরকে ভয়ের বদলে স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে পারে।

পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি যেভাবে সমস্যা বাড়ায়

দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক পরিবারে ঋতুস্রাবের সময়কার স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে মেয়েটিকে বাড়তি মানসিক চাপে ফেলা হয় — ‘তোমার মধ্যে কিছু একটা আছে’ জাতীয় মন্তব্য শুনতে শুনতে অনেক নারী নিজের প্রতি অস্বাভাবিক ভীতি তৈরি করে ফেলেন, যা প্রকৃতপক্ষে তার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ করে। এছাড়া এই ভুল ধারণার সুযোগ নিয়ে অসাধু কবিরাজ বা ‘হুজুর’ চড়া দামে তাবিজ-কবজ বিক্রি করেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শিরকের কাছাকাছি একটা চর্চা। এই ধরনের সমাধানের বদলে প্রথমে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করানো, এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ।

স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের বোঝাপড়া কেমন হওয়া উচিত

ঋতুস্রাবজনিত কষ্টের সময় নারীর পাশে থাকা মানুষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক স্বামী এই সময়টাকে স্ত্রীর ‘বদমেজাজ’ হিসেবে দেখেন এবং তর্কে জড়িয়ে পড়েন, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। বরং এই সময়ে সহানুভূতিশীল থাকা, বাড়তি কাজের চাপ কমিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া — এই ছোট পদক্ষেপগুলো সম্পর্কের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইসলামি শিক্ষায় স্ত্রীর প্রতি সদয় ও ধৈর্যশীল আচরণের ওপর বারবার জোর দেওয়া হয়েছে, বিশেষত এমন সময়ে যখন তার শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কষ্টে থাকে। একইসাথে নারীদের নিজেদেরও এই সময়ে অতিরিক্ত অপরাধবোধে ভোগার দরকার নেই — রাগ বা কান্না যদি হরমোনজনিত কারণে হয়, তাহলে এর জন্য নিজেকে দোষারোপ করার বদলে বিষয়টা বোঝা ও ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করাই যথেষ্ট।

করণীয় আমল ও দোয়া

ঋতুস্রাবের সময় শারীরিক ও মানসিক কষ্ট লাঘবের জন্য নিয়মিত এই দোয়াটি পড়া যেতে পারে, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসুস্থ ব্যক্তির জন্য পড়তেন —

اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বান নাস, আযহিবিল বা’সা, ইশফি আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাক্বামা।
অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের প্রতিপালক, কষ্ট দূর করে দাও, তুমিই একমাত্র আরোগ্যদাতা, তোমার আরোগ্যদান ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দাও যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না (সহীহ বুখারী)।

এর পাশাপাশি নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পাঠ, প্রয়োজনে ব্যথার জায়গায় হাত রেখে রুকইয়াহ করা পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এসব আমল কখনোই ডাক্তারি চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং পাশাপাশি চলার মতো একটা আধ্যাত্মিক সহায়তা। হালকা গরম পানির সেঁক তলপেটে ব্যবহার করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং হালকা হাঁটাচলা — এই সাধারণ ঘরোয়া পদ্ধতিগুলোও ব্যথা কমাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মতভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত।

রেকর্ড রাখার অভ্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ

যেসব নারী প্রতি মাসে তীব্র উপসর্গে ভোগেন, তাদের জন্য একটা সহজ কিন্তু কার্যকর পরামর্শ হলো নিজের ঋতুস্রাব চক্র ও উপসর্গের একটা ডায়েরি রাখা — কোন দিন থেকে উপসর্গ শুরু হয়, কতদিন থাকে, কতটা তীব্র। এই তথ্য চিকিৎসকের কাছে গেলে সঠিক নির্ণয়ে সাহায্য করে, এবং নিজের জন্যও এটা বোঝা সহজ হয় যে সমস্যাটা একটা নির্দিষ্ট চক্রের সাথে যুক্ত কিনা, নাকি এলোমেলোভাবে যেকোনো সময় ঘটে। যদি দেখা যায় উপসর্গ শুধু ঋতুস্রাবের নির্দিষ্ট পর্যায়ের সাথেই সীমাবদ্ধ, তাহলে হরমোনজনিত কারণের সম্ভাবনা প্রবল, আর যদি সময়ের কোনো সম্পর্ক ছাড়াই এলোমেলোভাবে ঘটে, তাহলে অন্য কারণ খতিয়ে দেখা উচিত।

কখন পেশাদার সাহায্য নেওয়া জরুরি

যদি ঋতুস্রাবজনিত ব্যথা বা মানসিক পরিবর্তন এতটাই তীব্র হয় যে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়, প্রথমেই একজন গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত — কারণ পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস বা হরমোনজনিত অন্য সমস্যা থাকলে সেগুলোর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে। যদি চিকিৎসকের পরীক্ষায় কোনো শারীরিক সমস্যা না পাওয়া যায়, অথচ কুরআন তেলাওয়াতের সাথে অস্বাভাবিক তীব্র প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তখনই একজন অভিজ্ঞ রাক্বীর সাথে যোগাযোগ করা যুক্তিসঙ্গত।

সময় নিয়ে সততার সাথে বলা প্রয়োজন

হরমোনজনিত সমস্যা হলে চিকিৎসার মাধ্যমে উন্নতির একটা মোটামুটি ধারণাযোগ্য সময়রেখা থাকে, তবে প্রতিটি শরীর আলাদাভাবে সাড়া দেয়। আর যদি সত্যিই আধ্যাত্মিক কোনো প্রভাব থেকে থাকে, তাহলে তার নিরাময়ের সময় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় — এটা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। রুকইয়াহ কোনো চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিকল্প নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক একটা সহায়ক পদ্ধতি, যেখানে কোনো তাবিজ, পাল্টা জাদু বা অপ্রচলিত তদবিরের স্থান নেই।

প্রতি মাসের এই সময়টাকে ভয়ের বদলে বোঝাপড়ার সাথে সামলানো গেলে অনেক পরিবারের অনাবশ্যক দুশ্চিন্তা কমে যায়। শারীরিক পরীক্ষার পরও যদি সন্দেহ থেকেই যায়, আল-শিফায় নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের ভিত্তিতে বিষয়টা যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ আছে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/menstrual-hormonal-issues-mistaken-jinn


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ