বিদেশফেরত মানুষের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন: কারণ কী

বিদেশফেরত মানুষের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন: কারণ কী

প্রবাস থেকে ফেরার পর আচরণ, মেজাজ বা ধর্মীয় অনুশীলনে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবার প্রায়ই ভাবে জিনের আছর হয়েছে। বাস্তবে প্রবাসজীবনের মানসিক ক্লান্তি ও ট্রমাই এর প্রধান কারণ — বিস্তারিত জানুন।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

সাত বছর সৌদি আরবে থাকার পর করিম ভাই যখন দেশে ফিরলেন, প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। বিমানবন্দরে নেমে ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন, মায়ের হাতের রান্না খেয়ে বলেছিলেন এতদিনের সব কষ্ট ভুলে গেছেন। কিন্তু এক মাস পর থেকে পরিবার লক্ষ্য করল, তিনি রাতে ঘুমাতে পারছেন না, ছোটখাটো বিষয়ে প্রচণ্ড রেগে যাচ্ছেন, নামাজে আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছেন না, এমনকি মাঝেমধ্যে নিজে থেকেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে থাকছেন। একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে চিৎকার করে উঠলেন, শরীর ঘামে ভেজা, চোখেমুখে আতঙ্ক। প্রতিবেশীরা বলাবলি করছিলেন, "বিদেশে থাকতে গিয়ে নিশ্চয়ই কিছু একটা লেগে এসেছে।" প্রবাসফেরত মানুষের মধ্যে এই ধরনের আচরণগত পরিবর্তন বাংলাদেশে অস্বাভাবিক নয়, আর এটাকে দ্রুত জিনের প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতাও ব্যাপক। তবে বাস্তবতা অনেক বেশি স্তরযুক্ত, আর করিম ভাইয়ের মতো লাখো প্রবাসীর জীবনে এই গল্প নানাভাবে পুনরাবৃত্ত হয়।

নতুন জায়গায় গেলে সুরক্ষা চাওয়ার সুন্নাহ

সহীহ মুসলিমে খাওলা বিনতে হাকিম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোথাও অবতরণ করে বা থাকতে শুরু করে এবং এই দোয়া পড়ে, ওই স্থান ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার কোনো ক্ষতি হবে না।

আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খলাক — অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় চাই তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। (সহীহ মুসলিম)

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, নতুন জায়গায় যাওয়া বা বসবাস শুরু করা — বিশেষত অপরিচিত পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন মানুষের মধ্যে — এক ধরনের আধ্যাত্মিক ঝুঁকি বহন করে, যার জন্য নির্দিষ্ট দোয়া শেখানো হয়েছে। প্রবাসে যাওয়ার সময় বহু মানুষ এই সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন বা মনে রাখেন না, ফলে অজান্তেই এক ধরনের আধ্যাত্মিক সুরক্ষাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়।

প্রবাসজীবনের বাস্তব মানসিক চাপ যা আচরণ পরিবর্তন করে

প্রবাসফেরত মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বেশি যে কারণগুলো কাজ করে, তার প্রায় পুরোটাই মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এবং সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাযোগ্য।

  • বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে, একাকী ও কঠিন পরিশ্রমের জীবনযাপনের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্লান্তি বা বার্নআউট।
  • কর্মক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার, প্রতারণা বা আর্থিক শোষণের শিকার হওয়ার ফলে সৃষ্ট মানসিক ট্রমা, যা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের মতো অবস্থার জন্ম দিতে পারে।
  • দেশে ফেরার পর পরিবারের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত — আর্থিক চাপ, নতুন করে জীবন গোছানোর দুশ্চিন্তা।
  • দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে গড়ে ওঠা কোনো আসক্তি, যা দেশে ফিরে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়।
  • দেশে ফিরে পরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারার একধরনের রিভার্স কালচার শক, যা আচরণে খিটখিটে ভাব বা প্রত্যাহারপ্রবণতা তৈরি করে।

এই কারণগুলোর প্রতিটিই একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে চিহ্নিত ও চিকিৎসাযোগ্য, এবং প্রবাসফেরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ধরনের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর নিজের মানসিক কষ্ট প্রকাশ না করেই বাঁচেন — পুরুষালি দৃঢ়তার সামাজিক প্রত্যাশা তাদের কষ্টের কথা বলতে বাধা দেয়।

প্রবাসে একাকীত্বের ট্রমা কীভাবে দেশে ফিরেও রয়ে যায়

প্রবাসজীবনে দীর্ঘদিন একটা ছোট রুমে সীমাবদ্ধ থেকে, নিজের ভাষা বলার মানুষ না পেয়ে, কারো সাথে মন খুলে কথা না বলে বছরের পর বছর কাটানো একজন মানুষের মানসিক গঠনে গভীর ছাপ ফেলে। দেশে ফিরে আসার পরও মস্তিষ্ক তখনও সেই সতর্ক, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় আটকে থাকে — ছোট শব্দে চমকে ওঠা, ভিড়ে অস্বস্তি বোধ করা, বা হঠাৎ কারণ ছাড়াই কান্না পাওয়া এই ধরনের প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়। এটা দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের স্বাভাবিক পরিণতি, যা সময় ও প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে সেরে ওঠে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা কেন প্রবাসীদের কাছে কঠিন

বাংলাদেশি সমাজে পুরুষদের মধ্যে বিশেষভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে কষ্টের কথা প্রকাশ করা দুর্বলতার লক্ষণ, বিশেষত যে ব্যক্তি পরিবারের জন্য বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করছেন তার কাছ থেকে পরিবার সবসময় শক্তি ও দৃঢ়তা আশা করে। এই প্রত্যাশার চাপে অনেক প্রবাসী নিজের মানসিক কষ্টের কথা পরিবারকে জানান না, এমনকি দেশে ফেরার পরও না, কারণ তারা মনে করেন এতে পরিবার হতাশ হবে বা তাদের ত্যাগকে ছোট করে দেখবে। ফলে ভেতরে জমে থাকা এই কষ্ট বছরের পর বছর চেপে রাখা হয়, যতক্ষণ না তা আচরণে বা শরীরে প্রকাশ পেতে বাধ্য হয়। পরিবারের উচিত প্রবাসফেরত সদস্যকে এই বার্তা দেওয়া যে মানসিক কষ্টের কথা বলাটা লজ্জার নয়, বরং সাহসের কাজ, আর এই ধরনের খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করাই প্রথম পদক্ষেপ।

বিদেশে থাকাকালীন প্রকৃত আধ্যাত্মিক ঝুঁকির দিকগুলো

একইসাথে এটাও সত্য যে কিছু কিছু দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে স্থানীয় জাদু-টোনার চর্চা, সহকর্মীদের হিংসা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাজনিত ক্ষতির শিকার হওয়ার ঘটনা রুকইয়াহ চিকিৎসায় আসা রোগীদের বিবরণে পাওয়া যায়। বিশেষত যেসব কর্মক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকে বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি সহকর্মীদের হিংসা থাকে, সেখানে বদনজর বা জাদুর প্রভাবের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এক্ষেত্রেও দেশে ফেরার সাথে সাথেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয় — বরং আচরণ পরিবর্তনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা জরুরি, যেমন নির্দিষ্ট আয়াত শোনার সাথে শারীরিক প্রতিক্রিয়া, ঘুমের মধ্যে বারবার একই ধরনের দুঃস্বপ্ন, বা নামাজের প্রতি হঠাৎ তীব্র অনীহা যা আগে কখনো ছিল না।

করণীয় আমল ও পারিবারিক সহায়তা

প্রবাসফেরত ব্যক্তির জন্য পরিবারের প্রথম দায়িত্ব হলো ধৈর্য সহকারে তার কথা শোনা, তাকে দোষারোপ না করে বরং মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া। দেশে ফেরার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীরা একটা নির্দিষ্ট দোয়া পড়তেন, যা ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে।

আইয়িবূনা তাইবূনা আবিদূনা লিরাব্বিনা হামিদূন — অর্থ: আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতকারী, আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

এই দোয়াটি দেশে ফেরার সময় মনে মনে বা সশব্দে পড়ার অভ্যাস একজন প্রবাসীর মানসিক প্রত্যাবর্তনকেও সহজ করে দিতে পারে — এটা মনে করিয়ে দেয় যে এই প্রত্যাবর্তন কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং আল্লাহর দিকে ফেরার একটা সুযোগও। এর পাশাপাশি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পাঠ, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ফিরে আসার চেষ্টা এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানো — এই সাধারণ পদক্ষেপগুলো মানসিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক। যদি সন্দেহ থাকে যে বিদেশে থাকাকালীন কোনো আধ্যাত্মিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাহলে ওপরে উল্লেখিত নতুন স্থানের দোয়াটি এখনও নিয়মিত পড়া যেতে পারে, পাশাপাশি রুকইয়াহ করা পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

পরিবারের প্রস্তুতি — বিদেশে যাওয়ার আগেই

যারা নতুন করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য যাওয়ার আগেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া ভবিষ্যতের অনেক সমস্যা এড়াতে সাহায্য করতে পারে। যাওয়ার আগে নিয়মিত নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস দৃঢ় করে নেওয়া, পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার একটা সময়সূচি ঠিক করে নেওয়া, এবং কোনো সমস্যা হলে কার সাথে যোগাযোগ করবেন তা আগে থেকেই জেনে রাখা — এই প্রস্তুতিগুলো প্রবাসজীবনের মানসিক চাপ সামলাতে সহায়ক হয়। এছাড়া নতুন জায়গায় পৌঁছেই আশ্রয়ের দোয়াটি পড়ার অভ্যাস শুরু থেকেই গড়ে তোলা, এবং কর্মক্ষেত্রে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে দ্রুত পরিবার বা বিশ্বস্ত কারো সাথে তা শেয়ার করার অভ্যাস — এসব ছোট ছোট প্রস্তুতি বড় সমস্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে ফেরার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ কীভাবে কাটানো উচিত

দেশে ফেরার প্রথম কয়েক সপ্তাহে পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রশ্ন বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ না দিয়ে বরং প্রবাসফেরত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া উচিত। বড় কোনো সিদ্ধান্ত, যেমন নতুন ব্যবসা শুরু করা বা বিয়ের কথাবার্তা, তাড়াহুড়ো করে না নিয়ে অন্তত কয়েক সপ্তাহ বিশ্রাম ও পরিবারের সাথে সময় কাটানোর পর নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এই সময়ে হালকা শরীরচর্চা, পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করা এবং প্রিয় কোনো শখের কাজে ফিরে যাওয়া মানসিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। পরিবারের সদস্যরা যদি তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আগ্রহ দেখিয়ে ধৈর্য সহকারে শোনেন, তাহলে তা প্রবাসফেরত ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা হয়ে ওঠে।

কখন পেশাদার সাহায্য নেওয়া জরুরি

যদি প্রবাসফেরত ব্যক্তির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, আত্মহত্যার চিন্তা, তীব্র উদ্বেগ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দ্রুত একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি — এটা কোনোভাবেই দুর্বলতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। যদি চিকিৎসাগত মূল্যায়নে কোনো নির্দিষ্ট মানসিক সমস্যা না পাওয়া যায়, অথচ সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক লক্ষণ অব্যাহত থাকে, তখন একজন অভিজ্ঞ রাক্বীর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

সময় নিয়ে বাস্তবতা

প্রবাসজীবনের ক্লান্তি ও মানসিক চাপ থেকে সেরে ওঠা, বা কোনো আধ্যাত্মিক প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া — উভয় ক্ষেত্রেই সময় লাগে, এবং তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। দেশে ফেরার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। ধৈর্য, পারিবারিক সহায়তা ও প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য — এই তিনের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে উন্নতি সম্ভব। নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে; কোনো তাবিজ, পাল্টা জাদু বা তদবির-শাস্ত্রের কোনো আমলের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

প্রবাসফেরত প্রিয়জনের আচরণ পরিবর্তন লক্ষ্য করলে প্রথমেই দোষারোপ না করে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজনে আল-শিফায় যোগাযোগ করে বিষয়টা বিস্তারিতভাবে যাচাই করা যেতে পারে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/returning-expatriates-sudden-behavior-change


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ