
সিহর তাসখীর: কাউকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জাদু থেকে মুক্তির উপায়
স্বামী বা সন্তান হঠাৎ একজন নির্দিষ্ট মানুষের কথায় অন্ধের মতো চলছেন, নিজের পরিবারকে অবহেলা করছেন— এই আচরণের পেছনে সিহর তাসখীর নামের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক জাদু থাকতে পারে। এর লক্ষণ, কারণ ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক প্রতিকার।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
একজন স্বামী বিয়ের প্রথম কয়েক বছর স্ত্রী-সন্তানের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল ছিলেন। হঠাৎ এমন হয়ে গেলেন যে নিজের মা অথবা পরিচিত একজন নির্দিষ্ট নারীর একটা কথায় সংসারের সব সিদ্ধান্ত উল্টে ফেলেন। স্ত্রী যত যুক্তি দেখান, যত কান্নাকাটি করেন, তাতে কোনো প্রভাব পড়ে না। অথচ ওই একজন মানুষের একটা ফোন কলে তিনি ব্যবসার সব টাকা তুলে দিয়ে দেন, সন্তানদের সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করেন, এমনকি সংসার ছেড়ে চলে যেতেও রাজি হয়ে যান। পরিবারের মানুষ প্রথমে ভাবেন এটা চরিত্রের সমস্যা বা অন্য কারো প্ররোচনা। সময়ের সাথে বোঝা যায়, বিষয়টা স্বাভাবিক জেদ বা রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং প্রায় যান্ত্রিক এক বাধ্যবাধকতা— যেন কেউ রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে চালাচ্ছে।
রুকইয়াহ চর্চায় এই ধরনের জাদুকে বলা হয় সিহর তাসখীর, অর্থাৎ কাউকে পুরোপুরি নিজের ইচ্ছার অধীনে নিয়ে আসার জাদু। এখানে ভুক্তভোগীর নিজের বিচার-বুদ্ধি যেন সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে যায় একজন নির্দিষ্ট মানুষের সামনে বা তার প্রসঙ্গে। আমাদের কাছে যেসব পরিবার এমন সমস্যা নিয়ে আসেন, তাদের অভিজ্ঞতায় একটা মিল বারবার চোখে পড়ে— ভুক্তভোগী অন্য সব বিষয়ে স্বাভাবিক আচরণ করেন, শুধু একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রসঙ্গে এলেই তার চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
ঘটনাটি বাস্তবে কেমন দেখতে হয়
তাসখীর জাদুর শিকার মানুষের আচরণে একটা অদ্ভুত দ্বৈততা দেখা যায়। অফিসে, বন্ধুদের সাথে, এমনকি অন্য আত্মীয়দের সাথে তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকেন। যুক্তিসঙ্গত কথা বলেন, সিদ্ধান্ত নেন, সাধারণ মানুষের মতোই আচরণ করেন। কিন্তু নির্দিষ্ট একজন মানুষ— সেটা হতে পারে শাশুড়ি, একজন সাবেক প্রেমিকা, একজন ব্যবসায়িক অংশীদার, বা পরিবারের কোনো সদস্য— তার সামনে বা তার নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্র সে যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। এই মানুষটার কোনো অন্যায় আবদারও তার কাছে অন্যায় মনে হয় না। এই মানুষটার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে সে অস্বাভাবিক রকম রেগে যায়, যদিও অভিযোগগুলো একেবারে সত্য ও প্রমাণিত।
আরেকটা লক্ষণ হলো, ভুক্তভোগী নিজেও মাঝে মাঝে বুঝতে পারেন যে তার আচরণ স্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজেকে থামাতে পারেন না। একজন স্বামী হয়তো পরে অনুশোচনা করেন, ক্ষমাও চান, কিন্তু পরের বার একই পরিস্থিতিতে আবার একই আচরণ করেন। এই বারবার ফিরে আসা প্যাটার্নটাই তাসখীর জাদুকে সাধারণ সম্পর্কের সমস্যা থেকে আলাদা করে দেয়। সাধারণ পারিবারিক দ্বন্দ্বে মানুষ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু জাদুর প্রভাবে এই প্যাটার্ন বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থেকে যায়।
কুরআন-হাদীসে সিহরের বাস্তবতা
ইসলামে সিহর একটা বাস্তব বিষয় হিসেবে স্বীকৃত, এবং এটি মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, ইহুদি লাবীদ ইবনে আসাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর জাদু করেছিলেন। এর প্রভাব সম্পর্কে হাদীসের ভাষ্য হলো—
"হাত্তা কানা ইউখাইয়্যালু ইলাইহি আন্নাহু ইয়াফআলুশ শাইআ ওয়ামা ফাআলাহু" — অর্থাৎ, তাঁর কাছে এমন মনে হতো যে তিনি এমন কিছু করেছেন, অথচ তিনি তা করেনইনি। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৭৬৩; সহীহ মুসলিম)
এই হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, জাদু মানুষের উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে— এমনকি একজন নবীর ক্ষেত্রেও, যদিও তাঁর নবুওয়াত বা ওহীর কোনো ক্ষতি হয়নি, শুধু ব্যক্তিগত কিছু বিষয়ে বিভ্রম তৈরি হয়েছিল। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাসখীর ধরনের জাদুতে ভুক্তভোগীর মূল চরিত্র বা ঈমান নষ্ট হয় না, বরং তার উপলব্ধি ও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে একটা কৃত্রিম প্রভাব তৈরি হয়। এই বোঝাপড়াটা জরুরি, কারণ অনেক পরিবার মনে করেন ভুক্তভোগী মানুষটা "খারাপ হয়ে গেছে", অথচ প্রকৃতপক্ষে সে নিজেও একটা প্রভাবের শিকার।
কী কারণে এই ধরনের জাদু করা হয়
সম্পত্তি বা অর্থনৈতিক স্বার্থ
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন মানুষকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার পেছনে তার সম্পত্তি বা আয়ের উপর প্রভাব বিস্তারের ইচ্ছা কাজ করে। একজন পুত্রকে এমনভাবে বশ করা হয় যেন সে তার স্ত্রী-সন্তানের চেয়ে অন্য কারো স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
দ্বিতীয় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা
কোনো ব্যক্তির সাথে অবৈধ বা গোপন সম্পর্ক থাকলে, সেই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে বা প্রধান করে তুলতে তাসখীর জাদুর আশ্রয় নেওয়া হয় বলে বহু ঘটনায় দেখা গেছে। এখানে উদ্দেশ্য থাকে ভুক্তভোগীর মূল পরিবারের প্রতি টান কমিয়ে দেওয়া।
পারিবারিক ক্ষমতার লড়াই
যৌথ পরিবারে শাশুড়ি-বউয়ের দ্বন্দ্ব, বা ভাইবোনদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকেও এই ধরনের জাদুর প্রয়োগ ঘটতে দেখা যায়। উদ্দেশ্য থাকে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
করণীয়: দৈনন্দিন আমল ও দোয়া
এই ধরনের সমস্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুক্তভোগী মানুষটাকে দোষারোপ না করে তার জন্য দোয়া ও রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়া। নিচের আমলগুলো নিয়মিত করা যেতে পারে—
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সূরা আল-ফালাক্ব ও সূরা আন-নাস তিনবার করে পাঠ করা, এবং সম্ভব হলে ভুক্তভোগীর জন্য পড়ে তার শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়া।
- আয়াতুল কুরসি প্রতিদিন ফরজ নামাজের পর নিয়মিত পাঠ করা, কারণ এটি শয়তানি প্রভাব থেকে হিফাজতের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে হাদীসে বর্ণিত।
- ভুক্তভোগীর খাবার বা পানিতে যদি সন্দেহ থাকে যে জাদুর কোনো বস্তু মেশানো হয়েছে, সেক্ষেত্রে রুকইয়াহ পড়া পানি নিয়মিত পান করানো।
- ঘরে প্রতিদিন সূরা আল-বাক্বারাহর শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করা, কারণ হাদীসে এসেছে যে ঘরে যেখানে সূরা বাকারা তিলাওয়াত হয় সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।
- ভুক্তভোগীর জন্য একান্তে দোয়া করা— বিশেষ করে রাতের শেষ প্রহরে, যখন দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদীসে এসেছে।
এখানে একটা কথা স্পষ্ট করে বলে রাখা দরকার— পরিবারের অন্য সদস্যরা যেন কোনো পাল্টা জাদু, তাবিজ, বা তদবির-শাস্ত্রের কোনো আমলের দিকে না যান। এতে সাময়িক স্বস্তি মনে হলেও এটা শিরকের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং প্রকৃত সমাধান আসে না। কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহই একমাত্র বৈধ ও কার্যকর পথ।
কখন আলেম বা রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন
যদি ঘরোয়া রুকইয়াহ কয়েক সপ্তাহ চালিয়েও ভুক্তভোগীর আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, বা সমস্যা দিন দিন গুরুতর হতে থাকে— যেমন সে পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি মারাত্মক আকার নিচ্ছে, বা তার আচরণে সহিংসতা দেখা দিচ্ছে— তাহলে একজন অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য রাক্বীর সরাসরি সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা জরুরি যে সব ক্ষেত্রেই আচরণ পরিবর্তনের পেছনে জাদু থাকে না— মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বিষণ্নতা, বা সম্পর্কের প্রকৃত টানাপোড়েনও একই রকম উপসর্গ তৈরি করতে পারে। তাই একজন যোগ্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নও একই সাথে বিবেচনায় রাখা উচিত।
সময় নিয়ে বাস্তব কথা
তাসখীর জাদু থেকে মুক্তির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বলে দেওয়া সম্ভব নয়। কারো ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের নিয়মিত রুকইয়াহতেই উন্নতি দেখা যায়, আবার কারো ক্ষেত্রে মাসের পর মাস সময় লাগে। জাদুর তীব্রতা, এটি কতদিন ধরে চলছে, এবং ভুক্তভোগীর ঈমানি অবস্থা— এসব বিষয়ের উপর সময়টা নির্ভর করে। ধৈর্য হারিয়ে দ্রুত ফলাফলের আশায় ভুয়া কবিরাজ বা তান্ত্রিকের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি, কারণ এতে সমস্যা আরও জটিল হয়ে যেতে পারে।
নিরাময় একমাত্র আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই আসে। এই লেখায় বর্ণিত আমলগুলো কোনো নিশ্চিত ফলাফলের গ্যারান্টি নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহ অনুমোদিত উপায়ে সাহায্য প্রার্থনার একটা পথ মাত্র। এখানে কোনো শিরক বা কুফরি চর্চার স্থান নেই— কোনো পাল্টা জাদু নয়, কোনো তাবিজ নয়, তদবির শাস্ত্রের কোনো বই থেকে নেওয়া কোনো আমল নয়। যেসব ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা জড়িত থাকতে পারে, সেখানে এই লেখা চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়।
একজন প্রিয়জনকে এমন অবস্থায় দেখা অনেক কষ্টের। কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ধৈর্যের সাথে দোয়া ও রুকইয়াহ চালিয়ে গেলে, তাঁর ইচ্ছায় পরিবারে শান্তি ফিরে আসার পথ খুলে যেতে পারে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- হঠাৎ চুল পড়া ও চর্মরোগ কি জাদুর লক্ষণ? জানুন বাস্তব পার্থক্য
- মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, তবু কোনো সম্বন্ধ আসছে না কেন?
- তান্ত্রিক-কবিরাজের কাছে না গিয়ে জাদু থেকে বাঁচার দৈনন্দিন আমল
- বাচ্চাদের অস্বাভাবিক কান্না ও আচরণ পরিবর্তনের পেছনে কি জাদুর প্রভাব থাকতে পারে?
- পারিবারিক ব্যবসায় ভাইবোনদের হিংসা থেকে জাদুর ঝুঁকি ও প্রতিকার
- স্বপ্নে বারবার সাপ বা পোকামাকড় দেখার অর্থ কি জাদুর ইঙ্গিত?