
ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা: জিনের আছর নাকি শারীরিক কারণ
ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করাকে অনেক পরিবারই জিনের আছর ভাবে। প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে ব্রুক্সিজম নামক অত্যন্ত সাধারণ একটা চিকিৎসাগত সমস্যা থাকে — লক্ষণ, কারণ ও করণীয় বিস্তারিত জানুন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
রাতে ঘুমানোর সময় স্বামীর দাঁত কিড়মিড় করার শব্দে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যেত ফারজানা আপার। কখনো কখনো শব্দটা এত তীব্র হতো যে পাশের ঘর থেকেও শোনা যেত। শুরুতে বিষয়টাকে অভ্যাস ভেবে গুরুত্ব দেননি, কিন্তু কয়েক মাস পর দেখলেন সকালে উঠে স্বামীর চোয়াল ব্যথা করে, মাথাব্যথা হয়, এমনকি একটা দাঁতও কিছুটা ক্ষয় হয়ে গেছে — দাঁতের ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন সামনের দাঁতের কিনারা অস্বাভাবিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। শাশুড়ি বললেন, "ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা মানে জিনে ধরেছে, রাতে তার ওপর কিছু একটা ভর করে।" এই ধরনের ব্যাখ্যা বাংলাদেশে খুবই প্রচলিত, বিশেষত গ্রামীণ পরিবারগুলোতে। বাস্তবতা হলো, ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা বা চেপে ধরার পেছনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুপরিচিত ও অত্যন্ত সাধারণ একটা কারণ আছে, যাকে ব্রুক্সিজম বলা হয়।
শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয় চাওয়ার কুরআনি শিক্ষা
সূরা আল-মু'মিনূনে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এই দোয়া শেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ওয়া কুল রাব্বি আউযু বিকা মিন হামাযাতিশ শায়াত্বীন, ওয়া আউযু বিকা রাব্বি আই ইয়াহদুরূন — অর্থ: আর বলুন, হে আমার রব, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে, এবং হে আমার রব, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন তারা আমার কাছে উপস্থিত না হয়। (সূরা আল-মু'মিনূন, আয়াত ৯৭-৯৮)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঘুমের সময় সহ যেকোনো সময় শয়তানের প্ররোচনা বা উপস্থিতি থেকে আশ্রয় চাওয়া ইসলামের একটা স্বীকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তবে এই আয়াত এটা বলছে না যে ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার একমাত্র কারণ জিন বা শয়তান — বরং এটা সাধারণভাবে ঘুমের সময়কার আধ্যাত্মিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
ব্রুক্সিজম — চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুপরিচিত একটা সমস্যা
ঘুমের মধ্যে অজান্তে দাঁত চেপে ধরা বা কিড়মিড় করাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্রুক্সিজম বলা হয়, যা বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এর পেছনে যেসব কারণ প্রতিষ্ঠিত, তার মধ্যে আছে।
- দিনের বেলার মানসিক চাপ ও উদ্বেগ, যা রাতে ঘুমের মধ্যে চোয়ালের পেশির অনৈচ্ছিক সংকোচনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় — কর্মক্ষেত্রে বা সংসারে চাপে থাকা মানুষদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
- দাঁতের গঠনগত সমস্যা, যেমন উপরের ও নিচের দাঁতের সারির অসামঞ্জস্য বা ম্যালোক্লুশন।
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন, ধূমপান বা অ্যালকোহল গ্রহণ, যা স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে।
- স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমজনিত শ্বাসকষ্টের সমস্যা, যেখানে শরীর ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসনালী খোলার চেষ্টা করে চোয়ালের পেশি সংকুচিত করে।
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিশেষত কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ।
- শিশুদের ক্ষেত্রে দাঁত ওঠার সময়কার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেও এটা দেখা যেতে পারে, যা সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজে থেকেই কমে যায়।
এই কারণগুলোর কারণে সৃষ্ট ব্রুক্সিজমের জন্য একজন ডেন্টিস্ট নাইট গার্ড বা মাউথ গার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন, যা দাঁতের ক্ষয় রোধ করে, এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমেও এই সমস্যার উন্নতি হতে পারে।
শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ব্রুক্সিজমের পার্থক্য
ছোট শিশুদের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা প্রায়ই দাঁত ওঠা বা দুধ দাঁত থেকে স্থায়ী দাঁতে পরিবর্তনের একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যা সাধারণত বাড়তি দুশ্চিন্তার বিষয় নয় এবং বয়স বাড়ার সাথে নিজে থেকেই কমে যায়। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা প্রায়শই দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ঘুমের গুণগত মানের সমস্যার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে। তাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির হঠাৎ শুরু হওয়া তীব্র দাঁত কিড়মিড়ের সমস্যাকে সাম্প্রতিক জীবনের চাপের সাথে মিলিয়ে দেখা উচিত — চাকরি হারানোর দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা বা আর্থিক টানাপোড়েন প্রায়ই এই সমস্যার সাথে সময়ের দিক থেকে মিলে যায়।
নাইট গার্ড ছাড়া ঘরোয়া উপায়ে যা করা যায়
দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে বা তার পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া অভ্যাস চোয়ালের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। ঘুমানোর আগে ঘাড় ও চোয়ালের পেশিতে হালকা গরম তোয়ালে দিয়ে সেঁক দেওয়া, দিনের বেলা সচেতনভাবে খেয়াল রাখা যে দাঁত একসাথে চেপে আছে কিনা এবং সচেতনভাবে চোয়াল শিথিল করা, চুইংগাম চিবানোর অভ্যাস কমানো যা চোয়ালের পেশিকে অতিরিক্ত সক্রিয় রাখে, এবং ঘুমানোর আগে হালকা স্ট্রেচিং বা রিল্যাক্সেশন কৌশল অনুশীলন করা — এই ছোট অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে চোয়ালের চাপ কমাতে সাহায্য করে। যাদের সমস্যা মৃদু পর্যায়ে আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঘরোয়া পদক্ষেপগুলোই যথেষ্ট হতে পারে, তবে দাঁতের ক্ষয় বা তীব্র ব্যথা শুরু হলে দেরি না করে ডেন্টিস্ট দেখানো উচিত।
কখন আধ্যাত্মিক কারণ বিবেচনায় আনা যুক্তিসঙ্গত
দাঁত কিড়মিড় করার পাশাপাশি যদি নিচের লক্ষণগুলো একসাথে দেখা যায়, তাহলে আধ্যাত্মিক কারণ বিবেচনা করা যেতে পারে।
- দাঁত কিড়মিড়ের সাথে সাথে ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক শব্দ করা, গোঙানি বা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে চিৎকার করে জেগে ওঠা।
- ঘুমের মধ্যে শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনির মতো লক্ষণ।
- শুধু নির্দিষ্ট রাতে বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যেমন কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় থাকার পর এই সমস্যা তীব্র হওয়া।
- দাঁতের ডাক্তার দেখানো ও নাইট গার্ড ব্যবহারের পরও কোনো উন্নতি না হওয়া, বরং সমস্যা আরও বাড়তে থাকা।
এই ধরনের সম্মিলিত ও অস্বাভাবিক লক্ষণ ছাড়া শুধু দাঁত কিড়মিড় করাকে জিনের আছর ভাবা সমীচীন নয়, কারণ এটা এতটাই সাধারণ একটা শারীরিক সমস্যা যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর জন্য সুনির্দিষ্ট নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত আছে।
করণীয় আমল ও ঘুমের রুটিন
ঘুমানোর আগে রাতের বেলার আক্রমণ ও ভয় থেকে সুরক্ষার জন্য এই দোয়াটি পড়া যেতে পারে, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ভীত শিশুদের জন্যও শিখিয়েছেন বলে হাদীসে বর্ণিত আছে।
আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন গাদাবিহি ওয়া ইক্বাবিহি ওয়া শাররি ইবাদিহি, ওয়া মিন হামাযাতিশ শায়াত্বীনি ওয়া আই ইয়াহদুরূন — অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় চাই তাঁর ক্রোধ, শাস্তি, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট এবং শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে, আর তারা যেন আমার কাছে উপস্থিত না হয়। (জামে তিরমিযী, সুনানে আবু দাউদ)
এর পাশাপাশি ঘুমানোর আগে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি করা, দিনের মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা এবং আয়াতুল কুরসি পাঠ করে ঘুমাতে যাওয়া — এই অভ্যাসগুলো একসাথে চালিয়ে গেলে সমস্যার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট চোয়ালের পেশি হালকা করার ব্যায়াম, যেমন ধীরে ধীরে মুখ খোলা-বন্ধ করা বা গরম পানির সেঁক দেওয়া, চোয়ালের টানটান ভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে দন্ত চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন।
ব্রুক্সিজম প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রার পরিবর্তন
ব্রুক্সিজমের মূল কারণ যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসিক চাপ, তাই দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধানও মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনার মধ্যেই নিহিত। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, কাজ ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, এবং প্রয়োজনে মানসিক চাপের উৎস নিয়ে কারো সাথে খোলামেলা আলোচনা করা — এই অভ্যাসগুলো শুধু দাঁত কিড়মিড় করা কমাতেই নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। যাদের কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চাপ আছে, তাদের জন্য দিনের শেষে কিছুক্ষণ একা সময় কাটিয়ে দিনের ঘটনা মনে মনে গুছিয়ে নেওয়ার অভ্যাস, বা রাতে ঘুমানোর আগে হালকা ধর্মীয় বই পড়া বা তেলাওয়াত শোনা — এই ধরনের রুটিন মনকে প্রশমিত করে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।
সঙ্গীর ঘুম প্রভাবিত হলে কী করবেন
ফারজানা আপার মতো অনেকেই সঙ্গীর দাঁত কিড়মিড়ের শব্দে নিজের ঘুম নষ্ট হওয়ার কষ্ট ভোগ করেন, অথচ বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা বোধ করেন এই ভেবে যে সঙ্গী হয়তো লজ্জা পাবেন। বাস্তবে এটা একটা সাধারণ চিকিৎসাগত সমস্যা, তাই খোলাখুলি আলোচনা করে একসাথে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো পথ। যতদিন সমস্যার সমাধান না হয়, ততদিন কানে হালকা ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা বা প্রয়োজনে সাময়িকভাবে আলাদা বিছানায় ঘুমানোও একটা বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে, এতে সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমস্যাটাকে ব্যক্তিগত অবহেলা হিসেবে না দেখে একটা যৌথ সমস্যা হিসেবে সমাধানের চেষ্টা করা।
কখন পেশাদার সাহায্য নেওয়া জরুরি
দাঁত কিড়মিড় করার সমস্যা প্রথমে একজন ডেন্টিস্টকে দেখানো উচিত, বিশেষত যদি দাঁতের ক্ষয় বা চোয়ালে ব্যথা শুরু হয়ে থাকে। যদি ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট বা নাক ডাকার সমস্যাও থাকে, তাহলে একজন স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যদি এসব চিকিৎসাগত পদক্ষেপের পরও সমস্যা অব্যাহত থাকে এবং তার সাথে ওপরে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক লক্ষণ যুক্ত থাকে, তখনই একজন অভিজ্ঞ রাক্বীর সাথে যোগাযোগ করা যুক্তিসঙ্গত।
সময় নিয়ে বাস্তবতা
ব্রুক্সিজমের মতো দীর্ঘদিনের অভ্যাসগত সমস্যা কমতে সময় লাগে, নাইট গার্ড ব্যবহার ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্নতি হয়। যদি আধ্যাত্মিক কোনো কারণ সত্যিই জড়িত থাকে, তাহলে তার নিরাময়ের সময়ও নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এখানে স্পষ্ট থাকা জরুরি, রুকইয়াহ দাঁতের চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজনে পাশাপাশি চলার মতো একটা সহায়ক পন্থা, আর প্রকৃত নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে — কোনো পাল্টা জাদু বা তদবির-শাস্ত্রের কোনো আমল এখানে প্রযোজ্য নয়।
ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার সমস্যাকে প্রথমেই জিনের আছর না ভেবে দাঁতের ডাক্তার দেখানোই বিচক্ষণতার কাজ। এরপরও সন্দেহ থাকলে আল-শিফায় যোগাযোগ করে বিস্তারিত পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- জিনের আছর নাকি মৃগীরোগ? পার্থক্য বোঝার বাস্তব উপায়
- রাতে বাথরুমে জিনের সংস্পর্শের ঝুঁকি ও সুরক্ষার আমল
- জিনের আছরে কণ্ঠস্বর বা আচরণ বদলে যাওয়ার লক্ষণ কীভাবে চিনবেন
- ভাড়া বাসায় আগের ভাড়াটিয়ার রেখে যাওয়া জিন সমস্যা— করণীয় কী
- জিনের আছরে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা: কারণ, লক্ষণ ও করণীয়
- রুকইয়াহর সময় বারবার হাই তোলা: এর প্রকৃত ব্যাখ্যা কী
https://alshifa.bd/blog/teeth-grinding-during-sleep-jinn-or-physical