সিহর তাফরিক: স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদু কীভাবে চিনবেন

সিহর তাফরিক: স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদু কীভাবে চিনবেন

বিয়ের পর হঠাৎ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অকারণ ঘৃণা, সন্দেহ আর দূরত্ব তৈরি হলে তা স্রেফ পারিবারিক অশান্তি নাও হতে পারে। সিহর তাফরিক বা বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদুর লক্ষণ ও ইসলামসম্মত প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

সাত বছরের সংসার। দুই সন্তান। প্রতিবেশীরা পর্যন্ত জানত, এই দম্পতি একে অপরকে ছাড়া একদণ্ড থাকতে পারে না। তারপর হঠাৎ একদিন থেকে স্বামী স্ত্রীর গায়ের গন্ধ সহ্য করতে পারছেন না, কথায় কথায় রাগ উঠছে, সামান্য বিষয়েও তালাকের কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। স্ত্রী বলছেন, স্বামীর চোখের দিকে তাকালে মনে হয় তিনি অচেনা কাউকে দেখছেন। কোনো তৃতীয় পক্ষ নেই, আর্থিক সংকটও নেই, তবু সংসারটা প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে। বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে এই ধরনের ঘটনা ঘটে, আর এর পেছনে অনেক সময় থাকে সিহর তাফরিক—অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছেদ ঘটানোর উদ্দেশ্যে করা জাদু।

সিহর তাফরিক বলতে ঠিক কী বোঝায়

আরবি ভাষায় 'তাফরিক' শব্দের অর্থ পৃথক করে দেওয়া, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। ইসলামি পরিভাষায় সিহর তাফরিক বলতে বোঝানো হয় এমন এক ধরনের জাদু, যা নির্দিষ্টভাবে দুইজন মানুষের মধ্যে—বিশেষত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে—ভালোবাসা নষ্ট করে ঘৃণা, সন্দেহ ও দূরত্ব তৈরি করার উদ্দেশ্যে করা হয়। এটি প্রেম সৃষ্টির জাদু বা মহব্বতের জাদু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়, কারণ এখানে লক্ষ্য থাকে সম্পর্ক গড়া নয়, বরং একটি সুস্থ সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া।

এই ধরনের জাদু সাধারণত করানো হয় এমন কারো দ্বারা, যাদের ওই সংসারের সুখ সহ্য হয় না—হতে পারে সতীন, প্রত্যাখ্যাত সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকা, সম্পত্তির লোভে থাকা আত্মীয়, অথবা শাশুড়ি-ননদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে দুই পরিবেশেই এই সমস্যা নিয়ে মানুষ পরামর্শ চান, তবে অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারেন না যে এটি স্বাভাবিক দাম্পত্য কলহের চেয়ে ভিন্ন কিছু।

কুরআনে সিহর তাফরিকের সরাসরি উল্লেখ

সূরা আল-বাকারায় হারুত ও মারুত ফেরেশতাদ্বয়ের প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে এই ধরনের জাদুর কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে বলা হয়েছে, মানুষ তাদের কাছ থেকে এমন কিছু শিখত যা দিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারত।

"অতঃপর তারা তাদের দুজনের কাছ থেকে এমন বিদ্যা শিখত, যা দিয়ে তারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারত। অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম ছিল না।" — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১০২

এই আয়াতের শেষাংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলে দিয়েছেন, জাদুকর যতই চেষ্টা করুক, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো কোনো প্রকৃত ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদের নেই। অর্থাৎ সিহর একটি বাস্তব বিষয় হলেও, এর ক্ষমতা সীমাহীন নয়—এটি সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। এই আয়াতটি থেকে এটাও স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর উদ্দেশ্যে করা জাদু একটি স্বীকৃত ও বাস্তব বিষয়, কোনো কুসংস্কার নয়।

স্বাভাবিক দাম্পত্য কলহ, নাকি সিহর তাফরিক—পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন

প্রতিটি সংসারেই মতভেদ থাকে, রাগ-অভিমান থাকে। তাই প্রতিটি ঝগড়াকে জাদু বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকলে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

সিহর তাফরিকের সাধারণ লক্ষণসমূহ

  • হঠাৎ করে, কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই একজনের প্রতি অন্যজনের তীব্র ঘৃণা বা বিতৃষ্ণা তৈরি হওয়া, বিশেষত শারীরিক নৈকট্যের প্রতি অনীহা।
  • স্বামী বা স্ত্রী নিজেও বুঝতে পারেন যে তার এই আচরণ স্বাভাবিক নয়, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না—এক ধরনের ভেতর থেকে চালিত অনুভূতি।
  • ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে বড় আকারের ঝগড়া, এবং প্রতিটি ঝগড়ার পর তালাক বা বিচ্ছেদের কথা বারবার উঠে আসা।
  • এক পক্ষ শ্বশুরবাড়ি বা স্ত্রীর পরিবারের প্রতি অস্বাভাবিক সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠা, যেখানে আগে এমন সম্পর্ক ছিল না।
  • রাতে ঘুমের মধ্যে অস্থিরতা, দুঃস্বপ্ন, বা হঠাৎ ঘুম ভেঙে সঙ্গীর প্রতি অকারণ রাগ অনুভব করা।
  • সমস্যাটি শুরু হওয়ার সময়ের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা—যেমন কারো সঙ্গে বিরোধ, সম্পত্তি ভাগাভাগি, বা কারো হিংসার প্রকাশ—মিলে যাওয়া।

এই লক্ষণগুলোর একটি বা দুটি থাকলেই যে জাদু নিশ্চিত, তা বলা যায় না। কিন্তু যখন এই লক্ষণগুলো একসঙ্গে দেখা দেয়, বিশেষত হঠাৎ ও তীব্রভাবে, তখন বিষয়টি রুকইয়াহর মাধ্যমে যাচাই করে দেখা যুক্তিসঙ্গত।

কেন এই ধরনের জাদু করানো হয়

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সিহর তাফরিকের পেছনে সবচেয়ে বেশি থাকে হিংসা আর প্রতিহিংসা। দ্বিতীয় স্ত্রী চান স্বামীর সম্পূর্ণ মনোযোগ, তাই প্রথম স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা তৈরি করতে চান। প্রত্যাখ্যাত কোনো সাবেক সম্পর্কের মানুষ প্রতিশোধ নিতে চান। কেউ সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত করতে চান বলে দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে চান, কারণ বিচ্ছেদ হলে সম্পত্তির হিসাব পাল্টে যায়। কখনো কখনো শাশুড়ি বা ননদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেও এমন কাজ হতে দেখা যায়। এই বাস্তবতা মাথায় রাখলে বোঝা যায়, কেন প্রতিটি পরিবারেই সতর্কতা জরুরি, বিশেষত যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো বিরোধ বা ঈর্ষার আভাস পাওয়া গেছে।

ঘরে বসে করণীয়—কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক পদক্ষেপ

সিহর তাফরিকের সন্দেহ হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিয়মিত রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়া, ধৈর্য ধরা এবং সন্দেহের বশে সঙ্গীর প্রতি অবিচার না করা। নিচের পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা যেতে পারে।

  • প্রতিদিন ফজরের পর ও ঘুমানোর আগে সূরা আল-বাকারা, সূরা আল-ফালাক্ব ও সূরা আন-নাস তিলাওয়াত করা, বিশেষত ঘরের এমন জায়গায় বসে যেখানে দম্পতি একসঙ্গে সময় কাটান।
  • প্রতিদিনের ফরজ নামাজের পর নিয়মিত ইস্তেগফার ও দরুদ পাঠ করা, কারণ ঘরে বরকত ও প্রশান্তি নেমে আসার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
  • স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসে সমস্যাটি নিয়ে খোলামেলা কথা বলা—কারণ জাদুর প্রভাব থাকলেও সমাধানের একটি অংশ হলো একে অপরকে দোষারোপ না করে সমস্যাটিকে বাইরের একটি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা।
  • ঘরের প্রতিটি কোণ, বিশেষত শোবার ঘর, নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং তেলাওয়াতের মাধ্যমে রুকইয়াহ করা।

একটি নির্দিষ্ট দোয়া, যা এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে পড়া যেতে পারে:

উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা আল্লিফ বাইনা কুলুবিনা, ওয়া আসলিহ যা'তা বাইনিনা"
অর্থ: "হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ের মাঝে মিল-মহব্বত সৃষ্টি করে দিন, এবং আমাদের মাঝের সম্পর্ক ঠিক করে দিন।"

এই দোয়াটি স্বামী বা স্ত্রী যেকোনো একজন নিয়মিত, একাগ্রচিত্তে পড়তে পারেন, বিশেষত নামাজের পর সিজদায় বা তাহাজ্জুদের সময়।

কখন নিজে থেকে চেষ্টা না করে পেশাদার সাহায্য নেবেন

যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত রুকইয়াহ ও দোয়া চালিয়ে যাওয়ার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হয়, বরং ঘৃণা ও দূরত্ব বাড়তেই থাকে, তাহলে একজন অভিজ্ঞ, দ্বীনদার রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞের সরাসরি সহায়তা নেওয়া উচিত। বিশেষত যদি দেখা যায় সমস্যাটি তালাকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে, অথবা এক পক্ষ সম্পূর্ণভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন এবং নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, তখন বাড়িতে বসে সাধারণ আমলের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রুকইয়াহ প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া, যদি সন্দেহ হয় যে সমস্যাটির মূলে বাস্তবিকই কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন তীব্র বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত রোগ রয়েছে, তাহলে সেক্ষেত্রে যোগ্য মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেওয়া জরুরি—রুকইয়াহ এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক হতে পারে।

আরোগ্যের সময় নিয়ে সৎ কথা

এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়—কতদিনে ঠিক হয়ে যাবে? সত্যি বলতে, এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কারো ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের নিয়মিত রুকইয়াহতেই সম্পর্কে উন্নতি দেখা যায়, আবার কারো ক্ষেত্রে মাসের পর মাস সময় লাগতে পারে। এটি নির্ভর করে জাদুর তীব্রতা, দুজনের ঈমানি অবস্থা, ধৈর্য এবং আল্লাহর ইচ্ছার ওপর। কেউ যদি দাবি করে যে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে বা নির্দিষ্ট আমলে অবশ্যই সমাধান হবে, সেই দাবি নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। প্রকৃত নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, আর তাঁর ইচ্ছার সময়সীমা মানুষের জানার বাইরে।

শেষ কথা

একটি সংসার গড়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লাগে, কিন্তু ভেঙে যেতে সময় লাগে না। সিহর তাফরিকের সন্দেহ হলে প্রথম কাজ হলো ধৈর্য হারিয়ে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া, বরং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহর ওপর ভরসা রাখা। এখানে উল্লেখ করা প্রতিটি আমল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নেওয়া, এখানে কোনো পাল্টা জাদু, তাবিজ বা তদবির শাস্ত্রের কোনো চর্চা নেই—কারণ শিরক বা কুফরি চর্চার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যাদের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেছে এবং নিজেদের চেষ্টায় সুরাহা হচ্ছে না, তারা চাইলে একজন অভিজ্ঞ আলেমের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিস্তারিত রুকইয়াহ সেশনের ব্যবস্থা নিতে পারেন।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/sihr-tafriq-marriage-separation-magic


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ