
নবজাতকের কানে আযান ও ইকামত দেওয়ার সুন্নাহ - নিয়ম ও তাৎপর্য
সন্তান জন্মের পরপরই কানে আযান দেওয়ার সুন্নাহর সঠিক নিয়ম, এর পেছনের হাদিসভিত্তিক তাৎপর্য এবং হাসপাতালে ব্যবহারিকভাবে কীভাবে এটি পালন করবেন তার বিস্তারিত।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
রাত তিনটার দিকে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন ইমরান। কিছুক্ষণ আগেই নার্স এসে জানিয়ে গেছেন তার প্রথম সন্তান জন্ম নিয়েছে, একটি ফুটফুটে ছেলে। আনন্দে-উত্তেজনায় বুক কাঁপছে, কিন্তু মাথায় একটা প্রশ্নও ঘুরছে - এখন কি সাথে সাথে ভেতরে গিয়ে বাচ্চার কানে আযান দিতে হবে? কীভাবে দেবেন, কোন কানে আগে, কী বলতে হবে ঠিক মনে নেই। শাশুড়ি ফোনে বলে দিচ্ছেন একরকম, চাচা বলছেন আরেকরকম। এই বিভ্রান্তি নতুন বাবাদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ, কারণ এই সুন্নাহটি সম্পর্কে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য অনেকেরই জানা থাকে না।
হাদিসে যা বর্ণিত হয়েছে
এই আমলের মূল ভিত্তি হলো একটি হাদিস, যা আবু রাফি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
"আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, যখন ফাতিমা (রা.) হাসানকে জন্ম দিলেন, তখন তিনি হাসানের কানে নামাজের আযানের মতো আযান দিয়েছিলেন।" (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযি)
এই হাদিসটি নিয়ে হাদিসশাস্ত্রবিদদের মধ্যে সনদের মান নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য আছে - কেউ কেউ এর সনদকে দুর্বল বলেছেন, আবার অনেক মুহাদ্দিস একে হাসান পর্যায়ের বলে গ্রহণ করেছেন এবং একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এটি শক্তি অর্জন করেছে বলে মত দিয়েছেন। এই কারণেই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে এই আমলটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও গৃহীত, যদিও এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয় - বরং মুস্তাহাব বা প্রশংসনীয় সুন্নাহ হিসেবে বিবেচিত। তাই কোনো কারণে এটি পালন করা সম্ভব না হলে সেজন্য দুশ্চিন্তার কিছু নেই, তবে যেহেতু সুযোগ থাকে এবং এটি সহজ একটি আমল, তাই অনেক পরিবার এটি যত্নসহকারে পালন করে থাকেন।
কীভাবে করবেন - সঠিক পদ্ধতি
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সন্তান জন্মের পরপরই তার ডান কানে সাধারণ আযান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে খুব উঁচু আওয়াজে বলার প্রয়োজন নেই, বরং শিশুর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক আযানের শব্দগুলো ধীরে ও স্পষ্টভাবে বলাই যথেষ্ট।
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সবচেয়ে মহান) - এভাবে শুরু করে পূর্ণ আযান ডান কানে বলা হয়, এবং অনুরূপভাবে পূর্ণ ইকামত বাম কানে বলা হয়, যেখানে অতিরিক্ত "ক্বাদ কামাতিস সালাহ" বাক্যটিও থাকে।
সাধারণত এই কাজটি বাবা নিজে করেন, তবে বাবা উপস্থিত না থাকলে বা কোনো কারণে অক্ষম হলে পরিবারের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ঈমানদার পুরুষ বা মহিলাও এটি করতে পারেন - এক্ষেত্রে লিঙ্গ বা সম্পর্কের কোনো কঠোর বিধিনিষেধ নেই, কারণ মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর প্রথম শ্রবণে আল্লাহর নাম ও তাওহীদের বাণী পৌঁছে দেওয়া।
এই আমলের পেছনের তাৎপর্য
আলেমগণ এই আমলের কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। প্রথমত, পৃথিবীতে আসার প্রথম মুহূর্তেই শিশু যেন আল্লাহর মহত্ত্বের ঘোষণা ও তাওহীদের বাণী শুনতে পায় - যা তার সমগ্র জীবনের একটি প্রতীকী সূচনা। ঠিক যেমন মৃত্যুর সময় কালিমা শোনানোর সুন্নাহ আছে, তেমনি জন্মের সময়ও আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু করার এই রীতি জীবনের দুই প্রান্তকে একই ঈমানি বার্তার মধ্যে বেঁধে দেয়। দ্বিতীয়ত, আযানের শব্দ শয়তানকে দূরে রাখতে সাহায্য করে বলে ইসলামি চিন্তাধারায় স্বীকৃত - হাদিসে এসেছে আযানের ধ্বনি শুনলে শয়তান পালিয়ে যায় (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। নবজাতকের জীবনের একেবারে শুরুতে এই সুরক্ষা প্রদান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
যে ভুল ধারণাগুলো এড়িয়ে চলা উচিত
এই আমল নিয়ে কিছু ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে, যেগুলো স্পষ্ট করা দরকার। প্রথমত, কানে আযান দিলেই শিশু ভবিষ্যতে হাফেজ হবে বা অসাধারণ দ্বীনদার হবে - এমন কোনো নিশ্চয়তা হাদিসে নেই। এটি একটি সুন্নাহ পালন এবং বরকতের আশায় করা আমল, কোনো নিশ্চিত ফলাফলের গ্যারান্টি নয়। দ্বিতীয়ত, আযান না দিলে শিশুর কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে বা তার ভবিষ্যৎ খারাপ হবে - এমন ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ নেই, যেহেতু এটি ওয়াজিব নয়। তৃতীয়ত, কিছু পরিবারে দেখা যায় আযান দেওয়ার সময় অতিরিক্ত জোরে চিৎকার করে বলা হয় বা শিশুকে অস্বস্তিকরভাবে নাড়াচাড়া করা হয় - এটি অপ্রয়োজনীয়, শান্তভাবে ও কোমলভাবে করাই উত্তম পদ্ধতি।
হাসপাতালে বাস্তবিক প্রয়োগ
আধুনিক হাসপাতালে সন্তান জন্মের পরপরই সাধারণত নবজাতকের প্রাথমিক চিকিৎসা পরীক্ষা, ওজন মাপা, প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন এবং মায়ের সাথে "স্কিন টু স্কিন" সংস্পর্শের একটি নির্দিষ্ট প্রোটোকল থাকে, যা চিকিৎসকরা নবজাতকের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে চিকিৎসা কর্মীদের কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করা উচিত, তাদের কাজে বাধা দিয়ে জোর করে আযান দিতে যাওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, শিশুকে যখন বাবার কোলে বা কাছে দেওয়া হয়, তখন শান্তভাবে এই আমল সম্পন্ন করা যায়। সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে অনেক সময় শিশুকে সাথে সাথে নিওনেটাল ইউনিটে নেওয়া হতে পারে বিশেষ পর্যবেক্ষণের জন্য - এমন পরিস্থিতিতে একটু দেরি হলেও সমস্যা নেই, চিকিৎসকদের অনুমতি নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সুবিধাজনক সময়ে এটি করা যেতে পারে।
যদি বাবা তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকতে না পারেন - কর্মস্থলে থাকার কারণে বা দূরবর্তী স্থানে থাকার কারণে - তাহলে দাদা, নানা বা পরিবারের অন্য কোনো বিশ্বস্ত সদস্য এই কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, অথবা বাবা ফিরে আসার পর কিছুক্ষণ দেরিতেও এটি করা যায়। সুন্নাহ পালনের ক্ষেত্রে সময়ের কড়াকড়ির চেয়ে আন্তরিকতা ও সুযোগমতো পালন করাই মূল বিষয়।
এর সাথে যুক্ত অন্যান্য সুন্নাহভিত্তিক আমল
- নবজাতকের জন্মের পর তাহনীক করা - একটি খেজুর চিবিয়ে নরম করে শিশুর মুখের তালুতে সামান্য লাগিয়ে দেওয়া, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে করতেন বলে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে।
- সন্তানের জন্য দোয়া করা এবং তার কল্যাণ কামনা করা।
- সপ্তম দিনে আকিকা ও নাম রাখার পরিকল্পনা করা - এই দুটি বিষয় নিয়ে আলাদাভাবে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন, কারণ এগুলোরও নিজস্ব নিয়ম ও গুরুত্ব রয়েছে।
শেষ কথা
আযান-ইকামতের এই সুন্নাহটি ছোট্ট একটি আমল হলেও এর মধ্যে গভীর একটি বার্তা লুকিয়ে আছে - সন্তানের জীবনের একেবারে প্রথম মুহূর্ত থেকেই তাকে আল্লাহর পরিচয়ের সাথে যুক্ত করার প্রচেষ্টা। এটি পালন করলে সন্তান নিশ্চিতভাবে কোনো বিশেষ গুণ নিয়ে বেড়ে উঠবে এমন প্রতিশ্রুতি নেই, বরং এটি একটি বরকতপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত। সন্তানের প্রকৃত দ্বীনদারি নির্ভর করে পরবর্তী বছরগুলোতে তাকে কীভাবে গড়ে তোলা হয় তার উপর, শুধু জন্মের সময়ের একটি আমলের উপর নয়। চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে, আর এই আমল পালন না করলে কোনো গুনাহ বা ক্ষতির আশঙ্কা নেই - এটি নিছক একটি প্রিয় ও প্রশংসনীয় সুন্নাহ, যা কুরআন-সুন্নাহর সীমার মধ্যেই থেকে পালন করা যায়, এখানে কোনো তাবিজ বা বাড়তি লোকাচারের প্রয়োজন নেই।
ইমরানের মতো নতুন বাবারা যখন এই মুহূর্তের মুখোমুখি হন, তাদের জন্য পরামর্শ হলো - শান্ত থাকুন, তাড়াহুড়ো করবেন না, হাসপাতালের নিয়ম মেনে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করুন, আর সুযোগ পেলে ধীরে-সুস্থে ভালোবাসা নিয়ে এই আমলটি সম্পন্ন করুন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- সন্তানের জেদ, রাগ ও অবাধ্যতা — জিনের প্রভাব নাকি স্বাভাবিক আচরণ?
- গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও ভয় — মানসিক স্বাস্থ্য ও ইসলামি দিকনির্দেশনা
- শিশুর রাতে ভয় পাওয়া ও ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠা — মা-বাবার করণীয়
- গর্ভধারণে দেরি হচ্ছে? হতাশ হওয়ার আগে যা জানা জরুরি
- গর্ভাবস্থায় নিয়মিত কোন সূরা ও দোয়া পড়বেন - সঠিক আমল ও ভুল ধারণা
- সন্তান প্রসবের সময় সহজতার জন্য যেসব আমল করা যায়