
গর্ভধারণে দেরি হচ্ছে? হতাশ হওয়ার আগে যা জানা জরুরি
বিয়ের কয়েক বছর পরও সন্তান না আসায় অনেক দম্পতি একা একা কষ্ট পান। এই লেখায় থাকছে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি, নবী-যুগের দৃষ্টান্ত, নির্দিষ্ট দোয়া এবং চিকিৎসাগত করণীয়ের সমন্বিত আলোচনা।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
বিয়ের তিন বছর পার হয়ে গেছে। প্রতিটা ঈদে শ্বশুরবাড়িতে গেলে খালার সেই এক প্রশ্ন - "কী খবর, সুখবর কবে দেবে?" ফেসবুকে স্ক্রল করতে গেলেই বন্ধুদের নতুন বাচ্চার ছবি চোখে পড়ে। নিজের ঘরে ফিরে দুজন চুপচাপ বসে থাকেন, কেউ কাউকে কিছু বলেন না, কিন্তু মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় - আমাদের ক্ষেত্রে কি কোনো সমস্যা আছে? এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অসংখ্য দম্পতির জীবনের বাস্তবতা। আত্মীয়স্বজনের কথা, সামাজিক চাপ আর নিজের ভেতরের অস্থিরতা মিলিয়ে একটা সময় মানুষ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
প্রথমেই একটা কথা স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার - বিয়ের পর দুই-তিন বছরে সন্তান না হওয়া মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় "ইনফার্টিলিটি" নির্ণয় করা হয় সাধারণত এক বছর নিয়মিত চেষ্টার পরও গর্ভধারণ না হলে, আর সেটাও নারীর বয়স, স্বাস্থ্য অবস্থা এবং আরও অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় শরীরে কোনো জটিল সমস্যা না থাকলেও স্রেফ সময়ের হেরফেরে দেরি হয়। তাই প্রথম ধাপেই নিজেদের "বন্ধ্যা" ভেবে দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়ার আগে বিষয়টিকে বাস্তবসম্মতভাবে দেখা জরুরি।
কুরআনে বিলম্বিত সন্তানের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত
কুরআনে হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর ঘটনা এক্ষেত্রে গভীর শিক্ষা দেয়। তিনি বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন, স্ত্রীও ছিলেন বন্ধ্যা - অথচ তিনি আশা ছাড়েননি। সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"স্মরণ কর, যখন সে তার প্রতিপালককে চুপিসারে ডেকেছিল। সে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক, আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে এবং মাথায় সাদা চুল ছেয়ে গেছে, আর হে আমার প্রতিপালক, তোমাকে ডেকে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি। ... তুমি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান কর, যে আমার এবং ইয়াকুবের বংশধরদের উত্তরাধিকারী হবে, আর হে আমার প্রতিপালক তাকে সন্তুষ্টিভাজন কর।" (সূরা মারইয়াম, আয়াত ৩-৬)
এই দোয়ার পরপরই আল্লাহ তাকে সুসংবাদ দেন - "হে যাকারিয়া, আমি তোমাকে ইয়াহইয়া নামক এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নামে ইতিপূর্বে আমি কাউকে অভিহিত করিনি।" (সূরা মারইয়াম, আয়াত ৭) লক্ষণীয় বিষয় হলো, যাকারিয়া (আ.) নিজে এই সুসংবাদে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন কীভাবে সম্ভব, যেহেতু তার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং তিনি নিজে অতি বৃদ্ধ। উত্তরে আল্লাহ বলেন এটি তাঁর জন্য সহজ। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বয়স বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা যতই কঠিন মনে হোক, আল্লাহর ইচ্ছার সামনে সেটা কোনো বাধা নয়। তবে এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে - যাকারিয়া (আ.) নিজে বহু বছর ধরে দোয়া করে গেছেন, হতাশ হননি, আর দোয়ার পাশাপাশি তিনি সন্তান লাভের ব্যাপারে একেবারে চুপ করেও বসে থাকেননি। এই দুটো জিনিস - ধৈর্যশীল দোয়া এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ - একসাথে চলা উচিত।
দোয়া কীভাবে করবেন
যাকারিয়া (আ.)-এর এই দোয়াটি নিয়মিত পড়া যেতে পারে, বিশেষত রাতের শেষ ভাগে বা নামাজের পর:
রব্বি লা তাযারনি ফারদাওঁ ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন
অর্থ: "হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নিঃসন্তান রেখো না, যদিও তুমিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।" (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৯)
এই দোয়াটি আসলে হযরত যাকারিয়া (আ.)-এরই আরেকটি দোয়া, যা কুরআনে ভিন্ন জায়গায় উল্লেখ হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন ফরজ নামাজের পর নিয়মিত ইস্তিগফার করা - অন্তত একশবার "আসতাগফিরুল্লাহ" পড়া - উপকারী হতে পারে। সূরা নূহে আল্লাহ বলেন, ইস্তিগফারের মাধ্যমে সন্তান ও সম্পদ বৃদ্ধির কথা এসেছে: "তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন ও তোমাদের জন্য নদী প্রবাহিত করবেন।" (সূরা নূহ, আয়াত ১০-১২)
এছাড়া দুজনে মিলে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। রাতের নির্জনতায় স্বামী-স্ত্রী একসাথে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিজেদের ভাষায় মন খুলে দোয়া করলে সেটা শুধু আধ্যাত্মিক উপকারই দেয় না, দুজনের সম্পর্কেও একটা শান্তি আনে - যা এই ধরনের মানসিক চাপের সময়ে অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসাগত দিকটি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না
এখানে একটা কথা স্পষ্টভাবে বলা দরকার - দোয়া আর চিকিৎসা একে অপরের বিপরীত নয়, বরং পরিপূরক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন, "আল্লাহ যে রোগ নাযিল করেছেন, তার প্রতিষেধকও নাযিল করেছেন" (সহীহ বুখারী)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণকে উৎসাহিত করে, এটাকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করা ভুল।
বিয়ের এক বছর নিয়মিত চেষ্টার পরও যদি গর্ভধারণ না হয়, তাহলে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই একজন গাইনোকোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, সমস্যাটা শুধু স্ত্রীর দিক থেকে যাচাই করা হয়, স্বামীর সেমেন অ্যানালাইসিস করানো হয় না - অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে প্রায় সমান সংখ্যক ক্ষেত্রে সমস্যাটা পুরুষের দিক থেকেও হতে পারে। তাই দুজনেরই একসাথে পরীক্ষা করানো উচিত, একজনকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা দরকার। থাইরয়েড সমস্যা, পিসিওএস, ওভুলেশন ডিসঅর্ডার, টিউব ব্লকেজ, বা পুরুষের স্পার্ম কাউন্ট কম থাকা - এসব সাধারণ কারণ, যার অধিকাংশই আধুনিক চিকিৎসায় সমাধানযোগ্য। কোনো লোকজ টোটকা, ঝাড়ফুঁক নামধারী প্রতারক বা তথাকথিত "কবিরাজি" চিকিৎসার পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট না করে সরাসরি প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
জীবনযাত্রার কিছু বাস্তব দিক
- নিয়মিত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো - দীর্ঘমেয়াদী স্ট্রেস হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা - অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন উভয়ই ওভুলেশনে বাধা দিতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানান।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা।
- নিয়মিত সহবাসের সময়কাল সম্পর্কে গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া - ওভুলেশন পিরিয়ড বোঝার জন্য।
পারিবারিক চাপ কীভাবে সামলাবেন
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় সন্তান না হওয়া নিয়ে আশেপাশের মানুষের মন্তব্য সহ্য করাটা অনেক সময় গর্ভধারণের চেষ্টার চেয়েও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। শাশুড়ি, খালা-ফুপু, প্রতিবেশী - সবাই একধরনের অধিকারবোধ নিয়ে প্রশ্ন করে ফেলেন, যেন এটা তাদেরও ব্যক্তিগত বিষয়। এই পরিস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সংহতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকা, পরিবারের সামনে একসাথে অবস্থান নেওয়া এবং প্রয়োজনে সরাসরি বলে দেওয়া যে এই বিষয়ে আল্লাহর ইচ্ছার উপর ভরসা রাখা হচ্ছে এবং ডাক্তারি পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে - এটুকু বললেই অনেক সময় বাড়তি প্রশ্ন কমে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও অবহেলার নয়। দীর্ঘদিন ধরে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেক নারী-পুরুষ অবসাদে ভোগেন, কেউ কেউ নিজেদের সম্পর্কের মধ্যেও দূরত্ব অনুভব করেন। প্রয়োজনে একজন কাউন্সেলরের সাথে কথা বলা লজ্জার কিছু নয়। ইসলামে মানসিক প্রশান্তির জন্য দোয়া, জিকির এবং আল্লাহর প্রতি ভরসার কথা বারবার এসেছে - সূরা রা'দে বলা হয়েছে, "যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয় - জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।" (সূরা রা'দ, আয়াত ২৮) নিয়মিত জিকির, বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার আযকার পাঠ, মনকে স্থির রাখতে সাহায্য করে।
ফলাফলের ব্যাপারে বাস্তবসম্মত থাকা
এই লেখায় যেসব দোয়া ও আমলের কথা বলা হলো, সেগুলো কোনো নিশ্চিত সময়সীমার প্রতিশ্রুতি দেয় না। কারো ক্ষেত্রে কয়েক মাসেই সুসংবাদ আসতে পারে, কারো ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে, আবার কারো ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত সহায়তা (যেমন আইভিএফ) প্রয়োজন হতে পারে। এই সবকিছুই আল্লাহর সিদ্ধান্তের অধীন - চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, আমাদের দায়িত্ব শুধু চেষ্টা আর দোয়া করা। এই লেখায় উল্লেখিত কোনো আমলই চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়, এবং এখানে কোনো পাল্টা জাদু, তাবিজ বা তদবির-শাস্ত্রের বই থেকে নেওয়া কোনো পদ্ধতি নেই - শুধুমাত্র কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যে দম্পতিরা এখন এই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি একটাই কথা - হতাশা যেন সম্পর্ককে ভেঙে না দেয়। যাকারিয়া (আ.) বছরের পর বছর দোয়া করে গেছেন, বার্ধক্যেও আশা ছাড়েননি। ডাক্তারের পরামর্শ নিন, নিয়মিত দোয়া করুন, একে অপরের পাশে থাকুন - বাকিটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- সন্তানের জেদ, রাগ ও অবাধ্যতা — জিনের প্রভাব নাকি স্বাভাবিক আচরণ?
- গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও ভয় — মানসিক স্বাস্থ্য ও ইসলামি দিকনির্দেশনা
- শিশুর রাতে ভয় পাওয়া ও ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠা — মা-বাবার করণীয়
- গর্ভাবস্থায় নিয়মিত কোন সূরা ও দোয়া পড়বেন - সঠিক আমল ও ভুল ধারণা
- সন্তান প্রসবের সময় সহজতার জন্য যেসব আমল করা যায়
- নবজাতকের কানে আযান ও ইকামত দেওয়ার সুন্নাহ - নিয়ম ও তাৎপর্য