
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত কোন সূরা ও দোয়া পড়বেন - সঠিক আমল ও ভুল ধারণা
গর্ভাবস্থায় সন্তানের কল্যাণে কোন সূরা পড়া উচিত, আর কোনগুলো নিছক প্রচলিত ভুল ধারণা - বাস্তবসম্মত ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক দিকনির্দেশনা।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
প্রথমবার গর্ভবতী হওয়ার খবর পাওয়ার পর সুমাইয়ার মনে একটার পর একটা প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। শাশুড়ি বলছেন সূরা ইউসুফ পড়লে নাকি সন্তান দেখতে সুন্দর হয়। পাশের বাসার ভাবি বলেছেন প্রতিদিন সূরা মারইয়াম না পড়লে সন্তান নাকি জেদি হয়। ননদ আবার বলছেন একটা নির্দিষ্ট তাবিজ পেটে বেঁধে রাখতে। এত এত পরস্পরবিরোধী কথার মধ্যে সুমাইয়া বুঝতে পারছেন না আসলে ইসলাম এই বিষয়ে কী বলে, আর কোনটা নিছক লোকমুখে প্রচলিত কথা। এই বিভ্রান্তি শুধু সুমাইয়ার একার নয় - বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গর্ভবতী নারীই কোনো না কোনো সময় এই ধরনের পরস্পরবিরোধী পরামর্শের মুখোমুখি হন।
সত্যি বলতে, গর্ভাবস্থায় কোন সূরা পড়লে সন্তান সুন্দর হবে বা কোনটা পড়লে বুদ্ধিমান হবে - এই ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি সহীহ হাদিসে পাওয়া যায় না। এগুলো মূলত লোকমুখে প্রচলিত কথা, যার সাথে দ্বীনি ভিত্তির সম্পর্ক নেই। তবে এর মানে এই নয় যে গর্ভাবস্থায় কুরআন তেলাওয়াতের কোনো গুরুত্ব নেই - বরং উল্টো, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত মায়ের মানসিক প্রশান্তির জন্য, তার ঈমান মজবুত রাখার জন্য এবং গোটা পরিবারের বরকতের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি অভ্যাস।
কুরআনে গর্ভধারণ ও মাতৃত্বের কষ্টের স্বীকৃতি
আল্লাহ তাআলা কুরআনে মায়ের গর্ভধারণ ও সন্তান লালনের কষ্টকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায় গর্ভাবস্থার প্রতিটি দিন আল্লাহর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
"আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্ট সহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট সহকারে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল ত্রিশ মাস।" (সূরা আল-আহকাফ, আয়াত ১৫)
এই আয়াতে আল্লাহ গর্ভধারণের প্রতিটি মুহূর্তের কষ্টকে স্বীকার করেছেন এবং সন্তানকে নির্দেশ দিয়েছেন এই কষ্টের প্রতিদান হিসেবে মায়ের সাথে সদাচরণ করতে। একজন গর্ভবতী নারীর জন্য এই আয়াতটি পড়া মানসিকভাবে অনেক সান্ত্বনাদায়ক হতে পারে - এটা বুঝতে সাহায্য করে যে তার শারীরিক কষ্ট, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, ঘুমের সমস্যা - এসবকিছুই আল্লাহর কাছে মূল্যবান এবং প্রতিদানযোগ্য একটি ইবাদতের অংশ।
তেলাওয়াতের অভ্যাস - কেন এবং কীভাবে
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের মূল উপকারিতা তিনটি দিক থেকে দেখা যায়। প্রথমত, এটি মায়ের মানসিক অবস্থাকে স্থিতিশীল রাখে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারী উদ্বেগ, মন খারাপ ভাব বা অস্থিরতায় ভোগেন। নিয়মিত তেলাওয়াত, বিশেষত ধীরে ধীরে তারতিলের সাথে পড়া, মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, এটি সন্তানের জন্মের আগে থেকেই ঘরে একটি দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করে - সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই যেন কুরআনের শব্দের সাথে পরিচিত হতে শুরু করে। তৃতীয়ত, এটি মায়ের নিজের আমলনামায় সওয়াব যোগ করে, যা যেকোনো সময়ের জন্যই একটি উত্তম অভ্যাস।
যদি কোনো নির্দিষ্ট সূরা বেছে নিতে হয়, তাহলে যেকোনো সূরাই পড়া যায় - তবে দীর্ঘ সূরা যেমন সূরা ইউসুফ, সূরা মারইয়াম বা সূরা লুকমান পড়লে একটানা কিছুক্ষণ সময় তেলাওয়াতে কাটানো যায়, যা মানসিক প্রশান্তির জন্য সহায়ক। সূরা লুকমানে সন্তানকে দেওয়া পিতার উপদেশগুলো (আয়াত ১২-১৯) একজন হবু মায়ের জন্য বিশেষভাবে অর্থবহ হতে পারে, কারণ এখানে সন্তান প্রতিপালনের মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা আছে। তবে এসব সূরা পড়লে সন্তান নির্দিষ্টভাবে "লুকমানের মতো জ্ঞানী" হয়ে যাবে - এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, এটি নিছক একটি অর্থবহ অভ্যাস মাত্র।
সন্তানের কল্যাণে সাধারণ দোয়া
নির্দিষ্ট সূরার বদলে বরং কুরআনে বর্ণিত নেককার সন্তান চাওয়ার দোয়াগুলো নিয়মিত পড়া বেশি অর্থবহ। ইবরাহীম (আ.)-এর দোয়া:
রব্বি হাবলি মিনাস সালিহীন
অর্থ: "হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একজন সৎকর্মশীল সন্তান দান কর।" (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০০)
এবং আরেকটি দোয়া যা মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে কুরআনে এসেছে:
রব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররতা আ'ইউন
অর্থ: "হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানাও।" (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪)
এই দোয়াগুলো প্রতিদিন নামাজের পর বা ঘুমানোর আগে পড়া যায়। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানের শারীরিক সৌন্দর্য বা বুদ্ধিমত্তার চেয়ে তার দ্বীনদারি ও চরিত্র - কারণ কুরআনে বারবার সৎকর্মশীল সন্তান চাওয়ার কথা এসেছে, বাহ্যিক গুণাবলীর কথা আসেনি।
প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে গর্ভাবস্থা নিয়ে অনেক প্রচলিত কথা শোনা যায়, যেগুলোর দ্বীনি ভিত্তি নেই। যেমন - নির্দিষ্ট সূরা পড়লে ছেলে সন্তান হবে, অমুক আয়াত না পড়লে সন্তানের ক্ষতি হবে, গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট সংখ্যক বার কোনো দোয়া না পড়লে অমঙ্গল হবে - এই ধরনের কথাগুলো মূলত কুসংস্কার, যা মানুষের মনে অহেতুক ভয় ও চাপ তৈরি করে। সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের বিষয়, কোনো সূরা পাঠের সাথে এর সম্পর্ক নেই - কুরআনেই এসেছে, "আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।" (সূরা আশ-শূরা, আয়াত ৪৯) তাই এই ধরনের কুসংস্কার থেকে দূরে থেকে বরং আন্তরিকভাবে দোয়া ও তেলাওয়াতে মনোযোগ দেওয়া উত্তম।
শারীরিক যত্ন ও চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ
আধ্যাত্মিক আমলের পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসাগত পরিচর্যা কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময় অন্তর গাইনোকোলজিস্টের কাছে চেকআপে যাওয়া, আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে সন্তানের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা, রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা - এসব গর্ভাবস্থার স্বাস্থ্যকর পরিণতির জন্য অপরিহার্য। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা ব্যায়াম (চিকিৎসকের অনুমতিক্রমে) এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম - এই সবকিছুই সন্তানের সুস্থ জন্মের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। কোনো একটিকে অন্যটির বিকল্প ভাবা ঠিক নয়। যদি গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা দেখা দেয় - রক্তক্ষরণ, তীব্র পেটে ব্যথা, প্রেশার বেড়ে যাওয়া, বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়া - তাহলে দেরি না করে সাথে সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, কোনো দোয়া বা আমল এক্ষেত্রে চিকিৎসার বিকল্প নয়।
দৈনন্দিন রুটিনে আমল যুক্ত করার একটা সহজ পদ্ধতি
- প্রতিদিন ফজরের পর কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করা, তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে।
- ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি ও শেষ দুই সূরা (ফালাক, নাস) পড়ে নিজের ও গর্ভস্থ সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে হেফাজত চাওয়া।
- সপ্তাহে অন্তত একবার সূরা লুকমান বা সূরা মারইয়াম পড়ার জন্য আলাদা সময় বের করা।
- নামাজের পর ইবরাহীম (আ.) ও অন্যান্য নবীদের সন্তান-বিষয়ক দোয়াগুলো নিজের ভাষাতেও প্রার্থনা করা।
ফলাফল সম্পর্কে বাস্তবসম্মত থাকা জরুরি
এই আমলগুলো পালন করলে সন্তান শতভাগ নির্দিষ্ট কোনো গুণ নিয়ে জন্মাবে, বা গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতা হবেই না - এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারে না। প্রতিটি গর্ভাবস্থা আলাদা, প্রতিটি সন্তান আল্লাহর একান্ত সিদ্ধান্তে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে। এই লেখায় উল্লেখিত তেলাওয়াত ও দোয়া চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ ও চেকআপের কোনো বিকল্প নয়, বরং এর পাশাপাশি পালনীয় একটি আধ্যাত্মিক অভ্যাস। এখানে কোনো তাবিজ, পাল্টা জাদু বা তদবির-শাস্ত্রের কোনো পদ্ধতির কথা বলা হয়নি - শুধু কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর তেলাওয়াত ও দোয়ার কথা বলা হয়েছে, আর চূড়ান্ত ফলাফল একমাত্র আল্লাহর হাতেই।
সুমাইয়ার মতো যেসব হবু মা এখন এই বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন, তাদের জন্য সহজ কথা হলো - প্রতিদিন কিছুটা সময় কুরআনের সাথে কাটান, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো নিয়মিত রাখুন, আর বাকিটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন। মন প্রশান্ত থাকলে শরীরও অনেকটা প্রশান্ত থাকে, আর এটাই একজন গর্ভবতী নারীর জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- সন্তানের জেদ, রাগ ও অবাধ্যতা — জিনের প্রভাব নাকি স্বাভাবিক আচরণ?
- গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও ভয় — মানসিক স্বাস্থ্য ও ইসলামি দিকনির্দেশনা
- শিশুর রাতে ভয় পাওয়া ও ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠা — মা-বাবার করণীয়
- গর্ভধারণে দেরি হচ্ছে? হতাশ হওয়ার আগে যা জানা জরুরি
- সন্তান প্রসবের সময় সহজতার জন্য যেসব আমল করা যায়
- নবজাতকের কানে আযান ও ইকামত দেওয়ার সুন্নাহ - নিয়ম ও তাৎপর্য