
শিশুর রাতে ভয় পাওয়া ও ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠা — মা-বাবার করণীয়
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠা বা কেঁপে ওঠা শিশুর সাধারণ ঘটনা হতে পারে। কখন এটি স্বাভাবিক, কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, আর কোন মাসনুন দোয়া ও সতর্কতা মা-বাবা অনুসরণ করতে পারেন — সহজ নির্দেশনা।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ
রাত দুটো। হঠাৎ ছোট্ট নাঈমের (ছদ্মনাম, বয়স চার) চিৎকারে মা ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। দেখলেন ছেলে বিছানায় চোখ খোলা রেখে বসে আছে, ঘামছে, কাঁদছে — কিন্তু মাকে যেন চিনতেই পারছে না। কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই শান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে জিজ্ঞেস করলে কিছুই মনে নেই। মা-বাবার মনে নানা প্রশ্ন — "কোনো খারাপ কিছু দেখল কি? বদনজর লাগল কি? কিছু কি ঘরে আছে?" এই আতঙ্ক স্বাভাবিক, কিন্তু সঠিক তথ্য জানলে অনেক দুশ্চিন্তা কমে।
শিশুদের রাতের ভয় — সাধারণ কিছু কারণ
ছোট শিশুদের ঘুমের ধরন বড়দের থেকে আলাদা। তাদের ঘুমে এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে যাওয়ার সময় হঠাৎ চমকে ওঠা, কাঁদা বা কথা বলা তুলনামূলক সাধারণ ঘটনা। কিছু বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে:
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুমের নিয়মিত সময় না থাকা
- ঘুমানোর আগে ভয়ের কার্টুন, ভিডিও বা গল্প দেখা বা শোনা
- দিনের বেলায় স্কুল, নতুন পরিবেশ, মা-বাবার অনুপস্থিতি বা ঝগড়ার চাপ
- জ্বর বা শারীরিক অস্বস্তি
- ঘরে অতিরিক্ত আলো, শব্দ বা গরম
- পরিবারে বড় কোনো পরিবর্তন — নতুন ভাইবোন, বাসা বদল, কারও মৃত্যু
দুঃস্বপ্ন আর "নাইট টেরর" — পার্থক্য জানুন
দুঃস্বপ্ন সাধারণত ঘুমের শেষ দিকে আসে; শিশু জেগে উঠে ভয়ের কথা বলতে পারে এবং কোলে নিলে সান্ত্বনা পায়। আর "নাইট টেরর" ঘুমের প্রথম ভাগে ঘটতে পারে — শিশু চোখ খোলা রেখে চিৎকার করে বা ছটফট করে, অথচ আসলে পুরোপুরি জাগ্রত নয়; তাকে সান্ত্বনা দিলেও সাড়া দেয় না, আর সকালে কিছু মনে রাখে না। এটি দেখতে ভয়ংকর হলেও সাধারণত শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে কমে যায়। এই পার্থক্য বুঝলে মা-বাবা অযথা আধ্যাত্মিক আতঙ্কে না ভুগে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
ঘরোয়া পরিবেশে যা করবেন
- নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক করুন — প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে শোয়ানো ও ওঠানো।
- ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টা শান্ত রাখুন — মোবাইল-টিভি বন্ধ, ভয়ের গল্প নয়; বরং আদর, সুরা পড়া ও ছোট দোয়া।
- হালকা আলো ও আরামদায়ক তাপমাত্রা রাখুন, যাতে শিশু নিরাপদ বোধ করে।
- রাতের ভয়ের সময় জোর করে জাগাবেন না — পাশে থাকুন, নিরাপদ রাখুন (যেন পড়ে না যায়), শান্ত কণ্ঠে ডাকুন। কয়েক মিনিটের মধ্যে সাধারণত শান্ত হয়ে যায়।
- পরদিন ভয় পাওয়ার বিষয়ে চাপ দেবেন না — "কী দেখেছিলি?" বারবার জিজ্ঞেস করলে ভয় আরও গেঁথে যেতে পারে।
- শিশুকে ভূত-জিনের ভয় দেখাবেন না — "চুপ কর, না হলে ভূতে ধরবে" ধরনের কথা শিশুর রাতের ভয় বাড়ায়।
ঘুমের সুন্নাহ ও মাসনুন দোয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমের জন্য কিছু আমল শিখিয়েছেন, যা শিশুর সাথে মিলে অভ্যাস করা যায়। ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া এবং "বিসমিকাল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহইয়া" (হে আল্লাহ, আপনার নামে মরি ও বাঁচি) বলা সুন্নাহ। শিশুকে ছোট ছোট দোয়া শেখান এবং নিজে পড়ে তার গায়ে ফুঁ দিয়ে হাত বুলিয়ে দিন।
ঘুমের মধ্যে ভয় পেয়ে গেলে নবীজি যে দোয়া শিখিয়েছেন তা হলো:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ وَشَرِّ عِبَادِهِ وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ — অর্থ: "আমি আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বাণীসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় চাই তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, শয়তানের প্ররোচনা থেকে এবং তাদের উপস্থিতি থেকে।" (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিযী)
আর শিশুদের সুরক্ষায় নবীজি হাসান ও হুসাইনের জন্য এই দোয়া পড়তেন বলে সহীহ বুখারীতে এসেছে: "উঈযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইত্বানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ" — অর্থাৎ আমি তোমাদের দুজনকে আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বাণীসমূহের আশ্রয়ে দিচ্ছি প্রতিটি শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী ও প্রতিটি কুদৃষ্টি থেকে। এই দোয়া মা-বাবা নিজেরা পড়ে শিশুর জন্য আশ্রয় চাইতে পারেন।
কখন অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের কাছে যাবেন
দোয়া ও ঘরোয়া যত্নের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো জরুরি:
- রাতের ভয় প্রায় প্রতি রাতে হচ্ছে বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলছে
- ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, জোরে নাক ডাকা, শ্বাস থেমে যাওয়া বা ঘন ঘন প্রস্রাব
- ঘুমের মধ্যে শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, ঝাঁকুনি, জিহ্বা কামড়ে ধরা বা জ্ঞান হারানো — এগুলো খিঁচুনির লক্ষণ হতে পারে, সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
- দিনের বেলাতেও অস্বাভাবিক ভয়, কান্না, খেলাধুলায় অনীহা বা স্কুলে যেতে না চাওয়া
- শিশু কোনো আঘাত বা নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকতে পারে — এই সন্দেহ হলে অবিলম্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন ও বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন
জিন-বদনজরের সন্দেহ — ধাপে ধাপে ভাবুন
শিশুর রাতের ভয় হলে সঙ্গে সঙ্গে "জিন লেগেছে" বা "বদনজর লেগেছে" ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আগে ঘুমের পরিবেশ, শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক চাপের কারণগুলো দেখুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বদনজর সত্য — তবে প্রতিটি সমস্যাকে এর ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত কারণ ধরা পড়ে না। কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী সুরক্ষার দোয়া নিয়মিত পড়ুন, আর শিশুর গলায় বা হাতে তাবিজ-কবজ বাঁধবেন না; তা শরিয়তসম্মত নয়। ঘরোয়া চিকিৎসা নিয়ে আরও জানতে পড়ুন বদনজরে আক্রান্ত শিশুর ঘরোয়া চিকিৎসা এবং সন্তানের জন্য প্রতিদিনের সুরক্ষার দোয়া।
শিশুকে নিরাপদ বোধ করান
অধিকাংশ রাতের ভয়ের সবচেয়ে কার্যকর "চিকিৎসা" হলো নিরাপত্তার অনুভূতি। শিশুকে জানান যে সে নিরাপদ, মা-বাবা পাশে আছেন, আর আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন। দিনের বেলায় তার সাথে সময় কাটান, মন খুলে কথা বলতে দিন, এবং ঘরের উচ্চ স্বরের ঝগড়া থেকে তাকে দূরে রাখুন। শিশুর ওপর কোনো শারীরিক আঘাত বা ভয় দেখানো নয় — ভালোবাসা ও ধৈর্যই তার মানসিক স্থিরতার ভিত্তি।
শেষ কথা
শিশুর রাতের ভয়ে মা-বাবার আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি বয়সের সাথে মিলিয়ে কমে যায়। ঘুমের নিয়ম মানুন, শান্ত পরিবেশ দিন, মাসনুন দোয়া ও সুরক্ষার আমল করুন, আর উপরে উল্লেখ করা লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের কাছে যান। হেফাজত ও আরোগ্য আল্লাহর হাতে — আমাদের দায়িত্ব সঠিক যত্ন নেওয়া এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখা।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- সন্তানের জেদ, রাগ ও অবাধ্যতা — জিনের প্রভাব নাকি স্বাভাবিক আচরণ?
- গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও ভয় — মানসিক স্বাস্থ্য ও ইসলামি দিকনির্দেশনা
- গর্ভধারণে দেরি হচ্ছে? হতাশ হওয়ার আগে যা জানা জরুরি
- গর্ভাবস্থায় নিয়মিত কোন সূরা ও দোয়া পড়বেন - সঠিক আমল ও ভুল ধারণা
- সন্তান প্রসবের সময় সহজতার জন্য যেসব আমল করা যায়
- নবজাতকের কানে আযান ও ইকামত দেওয়ার সুন্নাহ - নিয়ম ও তাৎপর্য
https://alshifa.bd/blog/child-night-fright-sleep-startle-parents-guide