সন্তান প্রসবের সময় সহজতার জন্য যেসব আমল করা যায়

সন্তান প্রসবের সময় সহজতার জন্য যেসব আমল করা যায়

প্রসব বেদনার ভয়ে আতঙ্কিত? মারইয়াম (আ.)-এর প্রসবকালীন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসলামি আমল ও বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির সমন্বিত আলোচনা।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

ডেলিভারির তারিখ যত এগিয়ে আসছে, নাজিয়ার রাতের ঘুম তত কমে যাচ্ছে। ইউটিউবে প্রসব বেদনার ভিডিও দেখে ফেলার পর থেকে তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে - কতটা কষ্ট হবে, তিনি সহ্য করতে পারবেন তো? বান্ধবীদের কাছ থেকে শোনা নানা রকম গল্প - কারো সহজ ডেলিভারি হয়েছে, কারো দীর্ঘ সময় লেবার পেইনে কষ্ট পেতে হয়েছে - সব মিলিয়ে মনে একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। প্রথমবার মা হতে যাওয়া প্রায় প্রতিটি নারীর মনেই এই ধরনের উদ্বেগ কাজ করে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মারইয়াম (আ.)-এর প্রসব বেদনার বাস্তব বর্ণনা

কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের সময় মারইয়াম (আ.)-এর প্রসব বেদনার একটি অত্যন্ত মানবিক ও বাস্তব বর্ণনা এসেছে। এটি লক্ষণীয় যে আল্লাহ তাআলা তাঁর সবচেয়ে সম্মানিত একজন নারী বান্দাকেও প্রসব বেদনার কষ্ট থেকে রেহাই দেননি - বরং কুরআনে তাঁর কষ্টের কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারেন।

"অতঃপর প্রসব বেদনা তাকে একটি খেজুর গাছের গোড়ায় নিয়ে গেল। সে বলল, হায়, আমি যদি এর আগেই মরে যেতাম এবং একেবারে বিস্মৃত হয়ে যেতাম। তখন তার নিচ থেকে তাকে ডেকে বলা হলো, দুঃখ কর না, তোমার প্রতিপালক তোমার নিচে একটি ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছেন। আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দাও, তোমার উপর তাজা পাকা খেজুর ঝরে পড়বে। অতএব তুমি খাও, পান কর এবং চোখ জুড়াও।" (সূরা মারইয়াম, আয়াত ২৩-২৬)

এই আয়াতগুলো থেকে অসাধারণ কিছু শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, মারইয়াম (আ.) নিজেও প্রসব বেদনার সময় তীব্র কষ্ট ও অসহায়ত্ব অনুভব করেছিলেন - এতটাই যে তিনি মৃত্যু কামনা করে ফেলেছিলেন। এটা প্রমাণ করে প্রসব বেদনায় ভয় পাওয়া বা কষ্ট অনুভব করা কোনো দুর্বলতা বা ঈমানের ঘাটতি নয়, এটা একেবারেই স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাঁর সাহায্য পাঠিয়েছেন একেবারে বাস্তব ও physical উপায়ে - পানির ঝর্ণা এবং তাজা খেজুর, যা পুষ্টি ও শক্তি জোগায়। এখান থেকে বোঝা যায়, আধ্যাত্মিক নির্ভরতার পাশাপাশি শারীরিক প্রস্তুতি ও পুষ্টির গুরুত্বও ইসলামে স্বীকৃত। তৃতীয়ত, আল্লাহ তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন "দুঃখ কর না" বলে - এই বাক্যটি প্রতিটি প্রসবকালীন নারীর জন্য এক ধরনের আশ্বাস, যে কষ্টের পরে স্বস্তি আসবেই।

প্রসবের সময় ও তার আগে পাঠযোগ্য দোয়া

প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার পর এবং প্রসবকালীন সময়ে কিছু দোয়া নিয়মিত পড়া যেতে পারে। সবচেয়ে সহজ ও শক্তিশালী একটি দোয়া হলো:

লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন
অর্থ: "তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র, নিশ্চয় আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।" (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৭, ইউনুস (আ.)-এর দোয়া)

এই দোয়াটি কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার একটি সর্বজনীন দোয়া হিসেবে পরিচিত। এছাড়া নিয়মিত আয়াতুল কুরসি পাঠ করা যায়, এবং সংক্ষিপ্ত করে বারবার "ইয়া লাতিফ" (হে কোমল, সদয় আল্লাহ) বলা - এটি এক ধরনের প্রচলিত জিকির যা কষ্টের সময় মানুষকে মানসিকভাবে স্থির রাখতে সাহায্য করে বলে অনেকে অভিজ্ঞতা থেকে বলে থাকেন। স্বামী বা পরিবারের কেউ প্রসবকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করার সময় নিয়মিত দোয়া ও ইস্তিগফার পড়তে থাকলে সেটাও একটি অর্থবহ সহায়ক আমল।

প্রসবের আগে সাধারণ প্রস্তুতিমূলক আমল

  • প্রসবের নির্ধারিত তারিখের কাছাকাছি সময়ে নিয়মিত সূরা মারইয়াম তেলাওয়াত করা, বিশেষত এই আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করা।
  • দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সহজ প্রসবের জন্য দোয়া করা।
  • সাদাকা করা - অনেক আলেম প্রসবের আগে সামর্থ্য অনুযায়ী সাদাকা করার পরামর্শ দেন, কারণ সাদাকা বিপদ দূর করে বলে হাদিসে এসেছে।
  • পরিবারের কাছে দোয়া চাওয়া - বিশেষত পিতামাতার দোয়া, যা ইসলামে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।

শারীরিক প্রস্তুতি অবহেলা করা যাবে না

মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনায় যেমন পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে physical সহায়তা এসেছিল, তেমনি আজকের যুগে চিকিৎসাগত প্রস্তুতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থার শেষ মাসগুলোতে নিয়মিত গাইনোকোলজিস্টের কাছে চেকআপে যাওয়া, বাচ্চার অবস্থান ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করানো, রক্তচাপ ও অন্যান্য জরুরি পরীক্ষা করানো অপরিহার্য। অনেক হাসপাতালে এখন প্রসবপূর্ব ক্লাস করানো হয়, যেখানে শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল ও ব্যথা মোকাবিলার শারীরিক পদ্ধতি শেখানো হয় - এসব ক্লাসে অংশ নেওয়া অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। কোন হাসপাতালে ডেলিভারি করাবেন, জরুরি প্রয়োজনে সিজারিয়ান অপারেশনের সুবিধা আছে কিনা - এসব আগে থেকে ঠিক করে রাখা উচিত, শেষ মুহূর্তে হুড়োহুড়ি এড়ানোর জন্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার - স্বাভাবিক প্রসব না হয়ে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হলে সেটা ব্যর্থতা নয়, বরং চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মায়ের ও সন্তানের জীবন রক্ষার জন্যই নেওয়া হয়। অনেক নারী মানসিকভাবে কষ্ট পান যখন তাদের সিজার করাতে হয়, মনে করেন যেন তারা কিছু "মিস" করলেন - অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান জন্মদানের পদ্ধতি নয়, বরং মায়ের নিয়ত ও প্রচেষ্টাই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই এখানে সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, ডাক্তারের পরামর্শ উপেক্ষা করে ঝুঁকি নেওয়া কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

স্বামী ও পরিবারের ভূমিকা

প্রসবের সময় স্ত্রীর পাশে স্বামীর মানসিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক হাসপাতাল এখন লেবার রুমে স্বামীকে থাকার অনুমতি দেয়। এই সময় স্বামী যদি স্ত্রীর হাত ধরে দোয়া পড়তে থাকেন, তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন, তাহলে স্ত্রীর মানসিক অবস্থার উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এছাড়া প্রসবের আগে ও পরে ঘরের অন্যান্য সদস্যদের উচিত অতিরিক্ত মন্তব্য বা ভীতিকর গল্প শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা - "আমার সময় তো সাতদিন লেগেছিল" জাতীয় কথা প্রসূতির মনে অহেতুক ভয় ঢুকিয়ে দেয়। বরং ইতিবাচক ও সাহসদায়ক কথা বলা, প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক সহযোগিতা দেওয়া - যেমন হাসপাতালে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা - এসব অনেক বেশি কাজের।

ফলাফল ও সময়ের ব্যাপারে বাস্তবতা

প্রতিটি প্রসব আলাদা। কারো ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টায় সহজে সন্তান জন্ম নেয়, কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগে, কারো ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয় যার জন্য জরুরি চিকিৎসা হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। এই আমল ও দোয়াগুলো মনের শক্তি জোগাতে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনার একটি মাধ্যম, কিন্তু এটি নিশ্চিত কোনো "সহজ প্রসবের গ্যারান্টি" নয়। চূড়ান্ত ফলাফল সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত হয়, আর চিকিৎসকের পেশাদার পরামর্শ ও তত্ত্বাবধান কোনো অবস্থাতেই উপেক্ষা করা যাবে না। এই লেখায় বর্ণিত কোনো আমলই ডাক্তারি চিকিৎসার বিকল্প নয়, এবং এখানে কোনো তাবিজ, পাল্টা জাদু বা তদবির-শাস্ত্রের প্রথা নেই - শুধুমাত্র কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক দোয়া ও বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির কথাই বলা হয়েছে।

নাজিয়ার মতো যারা প্রসবের ভয়ে রাত জেগে থাকেন, তাদের জন্য মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনা একটা বড় সান্ত্বনা - কষ্ট হবে, ভয় লাগাটাও স্বাভাবিক, কিন্তু আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরও এই কষ্টের মধ্য দিয়ে সাহায্য পাঠান। ডাক্তারের কথামতো প্রস্তুতি নিন, দোয়া করতে থাকুন, আর বিশ্বাস রাখুন - কষ্টের শেষে আল্লাহ একটি সুন্দর মুহূর্ত উপহার দেবেন ইনশাআল্লাহ।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/easy-childbirth-islamic-practices


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ