
তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব ও ইসলামি নির্দেশনা
তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্বে থাকা বাবা-মায়ের জন্য হিযানাতের ইসলামি বিধান, বয়সভেদে সন্তানের প্রতিক্রিয়া, সন্তানকেন্দ্রিক করণীয় ও আইনি পরামর্শের গুরুত্ব বিস্তারিত জানুন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
একটা সিদ্ধান্ত, দুটো ভাঙা মন
জান্নাতুলের তালাক হওয়ার পর সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা শুরু হলো তার পাঁচ বছরের ছেলেকে ঘিরে। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে দাবি এলো, ছেলে তার বাবার কাছে থাকবে, কারণ তারাই ভালো রাখতে পারবে। জান্নাতুল প্রতিটা সাক্ষাতের দিন কান্নাকাটি করেন, আদালতের বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, আর ছেলেকে দেখে মনে হয় সে বুঝে গেছে বাবা-মায়ের মাঝে সে যেন একটা টানাটানির বস্তু হয়ে গেছে। প্রতিবার সাক্ষাতের শেষে ছেলেটা তার হাত ছাড়তে চায় না, আর গাড়িতে ওঠার সময় পেছন ফিরে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না চোখের আড়াল হয়ে যায়।
তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে এই টানাপোড়েন বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে ঘটে। আইনি জটিলতা, পারিবারিক অহংকার, প্রতিশোধপরায়ণতা — সবকিছু মিলিয়ে শিশুটির প্রকৃত কল্যাণ অনেক সময় পেছনের সারিতে চলে যায়। অথচ ইসলামে এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা শুরু হয় সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কী তা বিবেচনা করে।
একটি হাদিস যা মায়ের অধিকার স্পষ্ট করে
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমার এই ছেলের জন্য আমার গর্ভ ছিল একটা পাত্র, আমার স্তন ছিল তার পানীয়ের উৎস, আমার কোল ছিল তার আশ্রয়স্থল। অথচ তার বাবা আমাকে তালাক দিয়ে এখন তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে চায়।" তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন —
"তুমিই তার প্রতি বেশি অধিকারী, যতক্ষণ না তুমি অন্যত্র বিবাহ করো।" (সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিস থেকে ফিকহবিদগণ "হিযানাহ" বা সন্তান লালন-পালনের অধিকার সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান নিয়েছেন। সাধারণভাবে ছোট বয়সের সন্তানের জন্য মা-ই সবচেয়ে বেশি অধিকারী বলে গণ্য হন, কারণ শিশুর আবেগিক ও শারীরিক প্রয়োজনে মায়ের স্নেহ ও যত্ন সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে বিবেচিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন মাযহাবে সন্তানের কত বছর বয়স পর্যন্ত এই অধিকার বলবৎ থাকবে তা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে, এবং একইসাথে বাবার ওপর সন্তানের অভিভাবকত্ব (উইলায়াহ) ও ভরণপোষণের (নাফাকাহ) দায়িত্বও বহাল থাকে। এই বিধানের পেছনের মূল চেতনাটা লক্ষণীয় — এখানে কোনো পক্ষের "জেতা" নয়, বরং শিশুর প্রকৃত প্রয়োজনকে কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
এই দ্বন্দ্বের বাস্তব চিত্র
সন্তানকে হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা
অনেক ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত দম্পতির মধ্যে সন্তান হয়ে ওঠে একে অপরকে কষ্ট দেওয়ার হাতিয়ার। এক পক্ষ সন্তানের সাক্ষাৎ আটকে রাখেন, অন্য পক্ষ সন্তানের কাছে সাবেক সঙ্গীর নামে খারাপ কথা বলেন। কখনো উপহার বা ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা চলে, কখনো আবার সাক্ষাতের সময়সূচি নিয়ে ইচ্ছাকৃত জটিলতা তৈরি করা হয়। এই আচরণ সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা বড় হওয়ার পরও তার সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বয়সভেদে সন্তানের প্রতিক্রিয়া
ছোট শিশুরা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরিস্থিতি বুঝতে না পারলেও পরিবর্তনটা টের পায় — নতুন পরিবেশ, একজনের অনুপস্থিতি, ঘন ঘন জায়গা বদল। স্কুলগামী শিশুরা প্রায়ই নিজেকে দোষী মনে করে, ভাবে তার কারণেই হয়তো এমন হয়েছে। কিশোর বয়সের সন্তানরা প্রকাশ্যে রাগ দেখাতে পারে, কোনো একপক্ষের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে ফেলার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারে। প্রতিটা পর্যায়ে বাবা-মায়ের ধৈর্য ও সহনশীলতার ধরন আলাদা হওয়া দরকার।
আইনি ও পারিবারিক জটিলতার মিশেল
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ এবং অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন — এই দুটোর আওতায় হিযানাত ও অভিভাবকত্বের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হয়। আদালতের বিবেচনায় সন্তানের কল্যাণকেই মূল মাপকাঠি ধরা হয়, যা কখনো কখনো ফিকহি সাধারণ নিয়মের সাথে সরাসরি না মিলে পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এই আইনি প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর হয়, একাধিক শুনানি, সাক্ষী, এবং কখনো কখনো সন্তানের নিজের মতামত জানার প্রক্রিয়াও এর অংশ হয়ে যায় — যা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সাক্ষাতের সময়সূচি নিয়ে বাস্তব জটিলতা
আদালতের সিদ্ধান্তে সাক্ষাতের অধিকার নির্ধারিত হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা প্রায়ই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় — নির্ধারিত দিনে সন্তানকে অসুস্থতার অজুহাতে দেখা করতে না দেওয়া, শেষ মুহূর্তে সময় পরিবর্তন করা, বা সাক্ষাতের সময় তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করানো — এসব ঘটনা অসংখ্য পরিবারে ঘটে। এই জটিলতা এড়াতে সম্ভব হলে সাক্ষাতের সময়সূচি লিখিতভাবে নির্দিষ্ট করে রাখা, এবং কোনো সমস্যা হলে সরাসরি ঝগড়ায় না গিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখাই বেশি কার্যকর।
বাবা-মা হিসেবে করণীয়
- সন্তানের সামনে সাবেক সঙ্গী সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য না করা, যতই কষ্ট থাকুক না কেন
- নিরাপত্তা ঝুঁকি না থাকলে সন্তানের জীবনে উভয় বাবা-মায়ের উপস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করা
- সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা সরাসরি সন্তানের সামনে না করে আলাদাভাবে বা প্রয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে করা
- সন্তানের বয়স ও মানসিক অবস্থা বুঝে তার সাথে সহজ ভাষায় পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা, তাকে দোষারোপের জায়গায় না রাখা
- নিজের রাগ বা ক্ষোভ সন্তানের মাধ্যমে সাবেক সঙ্গীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা না করা
- সাক্ষাতের সময়সূচি যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখা, যাতে সন্তান একটা নির্দিষ্ট রুটিনে নিরাপত্তা খুঁজে পায়
সন্তানের কল্যাণের জন্য দোয়া করাটা শুধু আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা নয়, বরং নিজের মনোযোগ প্রতিশোধের বদলে সন্তানের মঙ্গলের দিকে ফিরিয়ে আনার একটা মাধ্যমও।
রাব্বি হাবলি মিনাস সালিহীন — অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করো। (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০০)
এছাড়া সন্তানের সংশোধন ও কল্যাণের জন্য ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের অনুসরণে এই দোয়াও পড়া যায়।
রাব্বি আওযিয়্নি আন আশকুরা নি'মাতাকাল্লাতি আন'আমতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়া ওয়া আন আ'মালা সালিহান তারদাহু, ওয়া আসলিহ লি ফি যুররিয়্যাতি, ইন্নি তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল মুসলিমীন — অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে তৌফিক দাও যেন আমি তোমার সেই নিয়ামতের শোকর আদায় করতে পারি যা তুমি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে দিয়েছ, আর যেন এমন সৎকাজ করতে পারি যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও, আর আমার সন্তানদের মধ্যে সংশোধন করে দাও, আমি তোমার কাছে তওবা করছি এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আল-আহক্বাফ, আয়াত ১৫)
কখন পেশাদার সাহায্য জরুরি
অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিরোধ যখন আপসে মেটানো সম্ভব হয় না, তখন একজন দক্ষ পারিবারিক আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য, কারণ বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে এই বিষয়গুলোর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও নথিপত্র প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি সন্তানের মানসিক অবস্থা যাচাইয়ের জন্য একজন শিশু মনোবিদের সাহায্য নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যদি সন্তান আচরণগত পরিবর্তন দেখায় — পড়াশোনায় অমনোযোগ, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত রাগ বা চুপচাপ হয়ে যাওয়া। ফিকহি দিক থেকে হিযানাতের সঠিক বিধান জানতে একজন যোগ্য আলেমের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে, তবে চূড়ান্ত আইনি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়। অনেক বাবা-মা জিজ্ঞেস করেন, নতুন করে বিয়ে করলে সন্তানের হিযানাতের অধিকার কি সরাসরি হারিয়ে যায়। এই প্রশ্নের উত্তর মাযহাব ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে বলে এখানে সাধারণীকরণ করে কিছু বলা ঠিক না — এটা সরাসরি একজন যোগ্য আলেম বা পারিবারিক আইনজীবীর কাছ থেকে নিজের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী জেনে নেওয়া উচিত।
নিশ্চয়তাহীন এক বাস্তবতা
এটা স্বীকার করা প্রয়োজন যে অভিভাবকত্বের প্রতিটা মামলার ফলাফল একরকম হয় না, এবং কোনো পক্ষই আগে থেকে নিশ্চিত হতে পারেন না সিদ্ধান্ত কীভাবে আসবে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব তা হলো নিজের আচরণ ও সন্তানের প্রতি যত্ন। এখানে দেওয়া পরামর্শ ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা মাত্র, আইনি পরামর্শের বিকল্প নয়, এবং কোনো তাবিজ বা তদবিরের মাধ্যমে মামলার ফলাফল প্রভাবিত করার দাবি এখানে করা হচ্ছে না। নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
শেষ কথা
তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে টানাপোড়েন একটা বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। এই সময়ে নিজের কষ্ট আর সন্তানের কল্যাণকে আলাদা করে দেখতে পারাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে বাবা-মা সন্তানের প্রকৃত মঙ্গলকে সবার আগে রাখতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদে তারাই সন্তানের কাছে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করেন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- স্বামীর রাগের মাথায় তালাক শব্দ বলে ফেলা: করণীয় ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
- প্রবাসফেরত স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিতে না পারা ও স্ত্রীর স্বাধীনতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
- সন্তানেরা বড় হওয়ার পর দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি ও দূরত্ব
- স্বামীর মাদকাসক্তি বা জুয়ার নেশায় সংসার ধ্বংসের মুখে: স্ত্রীর করণীয়
- বারবার গর্ভপাতের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ও মানসিক যন্ত্রণা
- ননদ ও শ্বশুরবাড়ির কটূক্তি সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখা
https://alshifa.bd/blog/child-custody-emotional-struggle-after-divorce