
বারবার গর্ভপাতের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ও মানসিক যন্ত্রণা
একের পর এক গর্ভপাতের কষ্ট দম্পতির সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি করে, তার চিকিৎসাগত ও মানসিক কারণ, সূরা আল-বাকারার ধৈর্যের শিক্ষা এবং একসাথে এই শোক সামলানোর বাস্তব ও আধ্যাত্মিক পথ বিস্তারিত জানুন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
তিনবার হারানোর যন্ত্রণা
তিনবার গর্ভপাতের পর নাজমা ও তার স্বামীর মাঝে কথা বলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিটা ব্যর্থ চেষ্টার পর ঘরে নেমে আসে একধরনের নিঃশব্দ শোক, যা কেউ প্রকাশ করতে পারেন না। শাশুড়ি মাঝেমধ্যে ইঙ্গিতে বলেন, "আজকাল মেয়েদের শরীরে কী যে সমস্যা হয়," আত্মীয়রা দাওয়াতে জিজ্ঞেস করেন, "সুখবর কবে দেবে।" এই প্রতিটা প্রশ্ন নাজমার বুকে ছুরির মতো বেঁধে। আর স্বামীও নিজের কষ্ট চেপে রেখে চুপ করে থাকেন, ফলে দুজনের মাঝে একটা দেয়াল তৈরি হয়ে যায়, যেন একে অপরের কষ্টের কাছেও পৌঁছাতে পারছেন না। তৃতীয়বার হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে গাড়িতে দুজনে পাশাপাশি বসে ছিলেন, কেউ কোনো কথা বলেননি, শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
বারবার গর্ভপাতের অভিজ্ঞতা একটা দম্পতির জন্য শুধু শারীরিক নয়, গভীর মানসিক ও সম্পর্কগত সংকটও বটে। প্রতিটা গর্ভপাত একটা নতুন করে শোক পালনের মুহূর্ত, অথচ সমাজ প্রায়ই এই শোককে গুরুত্ব দেয় না, বরং একে "স্বাভাবিক কিছু" বলে উড়িয়ে দেয়।
কুরআনের সান্ত্বনা: বিপদে ধৈর্যের প্রতিদান
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারায় বলেন —
"আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও — যারা কোনো বিপদ এলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে দরূদ ও রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫-১৫৭)
এই আয়াতে "জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি" শব্দগুলো লক্ষণীয় — জীবনের ক্ষতি বলতে প্রিয়জন হারানোর কষ্টকেও বোঝানো হয়েছে, আর একটি প্রত্যাশিত সন্তান হারানো এই শ্রেণিতেই পড়ে। আল্লাহ এখানে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই ধরনের ক্ষতি একটা বাস্তব পরীক্ষা, এবং এই পরীক্ষায় ধৈর্য ধরে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" বলার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও হিদায়াতের প্রতিশ্রুতি। এই আয়াত এই বার্তাও দেয় যে শোক পালন করা দুর্বলতা নয়, বরং ঈমানের একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
এই কষ্ট দাম্পত্য সম্পর্কে যেভাবে প্রভাব ফেলে
একে অপরকে দোষারোপ করার প্রবণতা
অনেক পরিবারে গর্ভপাতের পর অজান্তেই স্ত্রীকে দায়ী করা হয়, যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে বারবার গর্ভপাতের পেছনে অনেক জটিল কারণ থাকতে পারে যা কারো একার নিয়ন্ত্রণে নেই — ক্রোমোজোমজনিত সমস্যা, জরায়ুর গঠনগত ত্রুটি, হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা, রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের শুক্রাণুর মানও একটা কারণ হতে পারে। এই দোষারোপ, তা মুখে না বলা হলেও, আচরণে প্রকাশ পায় এবং স্ত্রীর মনে গভীর অপরাধবোধ তৈরি করে।
স্বামীর নীরব শোক
আমাদের সমাজে পুরুষদের কষ্ট প্রকাশ করার সুযোগ কম দেওয়া হয়। স্বামীও এই ক্ষতিতে সমানভাবে ব্যথিত হন, কিন্তু "শক্ত থাকতে হবে" এই সামাজিক প্রত্যাশার কারণে নিজের কষ্ট চেপে রাখেন। ফলে স্ত্রী মনে করেন স্বামী তার কষ্ট বোঝেন না, অথচ বাস্তবে দুজনেই একইরকম শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, শুধু প্রকাশের ধরন আলাদা। কখনো কখনো স্বামী নিজের কষ্ট ঢাকতে কাজে বেশি ডুবে যান, যা স্ত্রীর কাছে উদাসীনতা বলে মনে হয়।
আত্মীয়দের অসতর্ক মন্তব্য
"সুখবর কবে," "বাচ্চা নিতে দেরি করো না," "অমুকের তো তিন মাসেই হয়ে গেছে" — এই ধরনের মন্তব্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালোবাসা থেকে আসে, কিন্তু বারবার গর্ভপাতের শোকের মধ্যে থাকা একজন নারীর কাছে এগুলো গভীর ক্ষত তৈরি করে। এই মন্তব্যের পেছনের অজ্ঞতা বুঝে নিয়ে প্রয়োজনে বিনয়ের সাথে সীমারেখা টেনে দেওয়াটাও একটা প্রয়োজনীয় দক্ষতা। একটা সহজ উত্তর তৈরি রাখা যায়, যেমন — "আল্লাহ যখন চান তখনই হবে, দোয়া করবেন," এই ধরনের সংক্ষিপ্ত জবাব প্রসঙ্গ পরিবর্তনে সাহায্য করে, বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
স্বামীর সহায়তার ধরন স্ত্রীর থেকে আলাদা হতে পারে
স্বামী হয়তো স্ত্রীর মতো কান্নাকাটি করে শোক প্রকাশ করেন না, বরং চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা, খরচের ব্যবস্থা করা, বা কাজে মনোযোগ দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার মধ্য দিয়ে নিজের কষ্ট সামলান। এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি — সহায়তার প্রকাশ সবার জন্য এক রকম হয় না। স্ত্রী যদি প্রত্যাশা করেন স্বামীও ঠিক তার মতো করেই কষ্ট প্রকাশ করবেন, তাহলে হতাশা বাড়তেই থাকবে। বরং দুজনে খোলাখুলি আলোচনা করে বুঝে নেওয়া ভালো, কীভাবে সহায়তা করলে একে অপরের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজে দেবে।
একসাথে এই কষ্ট সামলানোর পথ
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, দুজন একে অপরকে আলাদা না রেখে একসাথে শোক পালন করা।
- একে অপরকে দোষারোপ না করে বরং একসাথে বসে অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি করা
- প্রতিটা গর্ভপাতের পর নিজেদের শোক প্রকাশের জন্য সময় ও স্থান দেওয়া, তাড়াহুড়ো করে "স্বাভাবিক" হয়ে যাওয়ার চাপ না দেওয়া
- আত্মীয়দের অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে সীমারেখা টেনে দেওয়া, বিনয়ের সাথে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া
- দুজনে মিলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, একজনকে একা এই দায়িত্ব বহন করতে না দেওয়া
হযরত আইয়্যুব আলাইহিস সালাম যখন কঠিন বিপদে পড়েছিলেন, তিনি আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন তা সূরা আল-আম্বিয়ায় উল্লেখ আছে।
আন্নি মাসসানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন — অর্থ: আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সবচেয়ে বেশি দয়ালু। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৩)
সন্তান না হওয়ার শূন্যতা নিয়ে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়াও একই সূরায় এসেছে, যা দম্পতি একসাথে পড়তে পারেন।
রাব্বি লা তাযারনি ফারদান ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন — অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নিঃসন্তান রেখো না, আর তুমিই তো উত্তম উত্তরাধিকারী। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৯)
কখন পেশাদার সাহায্য জরুরি
বারবার গর্ভপাত হলে এটাকে শুধু ভাগ্য বা তকদির বলে মেনে না নিয়ে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বিস্তারিত পরীক্ষা করানো জরুরি। থাইরয়েড সমস্যা, রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা, জরায়ুর গঠনগত সমস্যা, হরমোনজনিত কারণ — এসব চিহ্নিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সুস্থ গর্ভধারণ সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি শোকের ভার বহন করতে সাহায্য করার জন্য একজন গ্রিফ কাউন্সেলর বা মনোবিদের সাহায্য নেওয়াও উপকারী হতে পারে, বিশেষ করে যদি শোক দীর্ঘদিন ধরে দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি — কিছু পরিবারে গর্ভপাতকে ভুলভাবে জাদু বা বদনজরের সাথে যুক্ত করে অন্য কাউকে দোষারোপ করা হয়, যা ভিত্তিহীন অভিযোগে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। রুকইয়াহ শারইয়্যাহ মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক সহায়তার জন্য গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু তা কখনোই চিকিৎসা পরীক্ষার বিকল্প নয়, বরং তার পাশাপাশি একটা সহায়ক অনুশীলন মাত্র। অনেক দম্পতি জিজ্ঞেস করেন, কতবার গর্ভপাত হলে "বারবার গর্ভপাত" ধরে চিকিৎসাগত তদন্ত শুরু করা উচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাধারণত পরপর দুই বা তিনবার গর্ভপাতের পর বিস্তারিত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে বয়স ও পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য ইতিহাস বিবেচনায় চিকিৎসক কখনো কখনো দুইবারের পরও তদন্ত শুরু করতে পারেন — এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের বিচার্য বিষয়।
ফলাফল নিয়ে সততার সাথে কথা বলা
এটা স্বীকার করা প্রয়োজন যে চিকিৎসা ও দোয়ার পরও প্রতিটা দম্পতি সুস্থ সন্তান লাভ করবেন এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। এটা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এখানে যা বলা হয়েছে তা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সান্ত্বনা ও ব্যবহারিক পরামর্শ, চিকিৎসাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিকল্প নয়। কোনো তাবিজ, ঝাড়ফুঁকের নামে বিপজ্জনক অনুশীলন বা অন্য কাউকে জাদুর অভিযোগে দোষারোপ করার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
শেষ কথা
বারবার গর্ভপাতের কষ্ট একটা দম্পতিকে ভেঙে দিতে পারে, আবার একসাথে সামলালে এটাই তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। এই কঠিন সময়ে একে অপরের হাত ধরে রাখা, চিকিৎসার পথ খোলা রাখা, আর আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- স্বামীর রাগের মাথায় তালাক শব্দ বলে ফেলা: করণীয় ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
- প্রবাসফেরত স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিতে না পারা ও স্ত্রীর স্বাধীনতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
- সন্তানেরা বড় হওয়ার পর দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি ও দূরত্ব
- স্বামীর মাদকাসক্তি বা জুয়ার নেশায় সংসার ধ্বংসের মুখে: স্ত্রীর করণীয়
- তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব ও ইসলামি নির্দেশনা
- ননদ ও শ্বশুরবাড়ির কটূক্তি সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখা
https://alshifa.bd/blog/recurrent-miscarriage-marital-strain