
ননদ ও শ্বশুরবাড়ির কটূক্তি সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখা
শ্বশুরবাড়িতে ননদ বা আত্মীয়দের প্রতিদিনের কটূক্তি একজন নারীর আত্মবিশ্বাস কীভাবে ভেঙে দেয়, ইসলামি আদব অনুযায়ী মর্যাদা রক্ষা করে সীমারেখা টানার উপায় এবং কখন পেশাদার সাহায্য জরুরি তা বিস্তারিত জানুন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
প্রতিদিনের ছোট ছোট আঘাত
প্রতিদিন রান্নার লবণ নিয়ে, সাজগোজ নিয়ে, বাবার বাড়ি থেকে আনা উপহার নিয়ে ননদের খোঁচা মেরে কথা বলার অভ্যাস। "ভাবি তো রান্নাই জানে না," "এত সাজগোজ করলে কী হবে, ঘরের কাজে তো মন নেই," "ওদের বাড়ি থেকে তো তেমন কিছুই দেয়নি।" এই কথাগুলো আলাদা আলাদাভাবে শুনলে হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, কিন্তু প্রতিদিন, বছরের পর বছর ধরে শুনতে শুনতে এক নারীর আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। স্বামী মাঝে থেকে চুপ থাকেন, বলেন, "ও তো এমনই, পাত্তা দিও না।" কিন্তু প্রতিদিনের এই কটূক্তি স্ত্রীর মনে জমতে জমতে গভীর বিষণ্নতায় রূপ নিতে থাকে। একদিন রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেঁদে ফেলেন, নিজেও জানেন না ঠিক কোন মন্তব্যটা সেদিনের কান্নার কারণ।
বাংলাদেশের যৌথ পরিবারব্যবস্থায় এই দৃশ্য অস্বাভাবিক নয়। ননদ, শাশুড়ি বা অন্য আত্মীয়দের কটূক্তি অনেক সময় "পরিবারের স্বাভাবিক রসিকতা" হিসেবে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়, অথচ এর প্রকৃত প্রভাব একজন নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অনেক গভীর হতে পারে।
ইসলাম কথাবার্তার আদব সম্পর্কে যা শেখায়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখের কথার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন —
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
এই হাদিস দুই দিক থেকে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, যারা কটূক্তি করেন তাদের জন্য এটা একটা সতর্কবার্তা — কারো মন আঘাত করে এমন কথা বলার আগে থামা উচিত। দ্বিতীয়ত, যিনি এই কথার শিকার হচ্ছেন তার জন্যও এটা একটা দিকনির্দেশনা — প্রতিটা কটূক্তির জবাবে পাল্টা কটূক্তি না দিয়ে বরং সংযত থাকা, প্রয়োজনে সরাসরি অথচ ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান জানানো। এই হাদিস নীরবে সব সহ্য করার কথা বলে না, বরং কথাকে যাচাই করে বলার কথা বলে — আর প্রয়োজনে নিজের সীমারেখা স্পষ্টভাবে জানানোও এর মধ্যে পড়ে।
এই পরিস্থিতির গভীরে কী আছে
স্বাভাবিকীকরণ করা কটূক্তি সংস্কৃতি
অনেক পরিবারে নতুন বউকে নিয়ে টিপ্পনী কাটা একধরনের প্রথায় পরিণত হয়েছে। এটা প্রায়ই "মজা করছি" এই যুক্তিতে ন্যায্যতা পায়, অথচ যিনি প্রতিদিন এই কথা শুনছেন তার কাছে এটা মজা নয়, বরং ক্রমাগত অপমান। এই সংস্কৃতি ভাঙা কঠিন কারণ পুরো পরিবার এটাকে স্বাভাবিক মনে করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কখনো কখনো ননদ নিজেও তার নিজের শ্বশুরবাড়িতে একই ধরনের আচরণের শিকার হয়ে এসেছেন, আর সেই না-প্রকাশিত ক্ষোভ ভাবির ওপর ঝাড়ছেন, না বুঝেই একটা চক্র চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বামীর নিষ্ক্রিয় অবস্থান
অনেক স্বামী পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য "পাত্তা দিও না" বলে দায়িত্ব সেরে ফেলেন, অথচ তার স্ত্রীর প্রয়োজন ছিল সক্রিয় সমর্থনের। এই নিষ্ক্রিয়তা স্ত্রীর মনে একটা অতিরিক্ত কষ্টের জন্ম দেয় — শুধু ননদের কথায় নয়, বরং স্বামীর পাশে না দাঁড়ানোর কারণেও। মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই পক্ষ সামলানোর ভয়ে অনেক স্বামী সহজ পথ বেছে নেন, যা আসলে সমস্যার সমাধান না করে শুধু পিছিয়ে দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বছরের পর বছর এই কটূক্তি সহ্য করতে করতে অনেক নারী নিজের মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন, নিজের রান্না বা সাজগোজ নিয়ে ক্রমাগত অনিরাপত্তায় ভোগেন, এমনকি নিজের বাবার বাড়ির পরিবারের সাথে সম্পর্কও দূরে সরিয়ে ফেলেন যাতে আর কোনো "উপহার নিয়ে খোঁটা" শুনতে না হয়। এই প্যাটার্ন সময়ের সাথে সাথে আত্মমর্যাদার গভীর ক্ষতি করে।
শাশুড়ির নীরব সমর্থন বা নীরব প্ররোচনা
অনেক পরিবারে শাশুড়ির ভূমিকা সিদ্ধান্তমূলক হয়ে দাঁড়ায় — তিনি চাইলে মেয়ের কটূক্তি বন্ধ করে দিতে পারেন, আবার চাইলে নীরবে তা প্রশ্রয়ও দিতে পারেন। যেসব পরিবারে শাশুড়ি নিরপেক্ষ থেকে ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়ান, সেখানে এই সমস্যা দ্রুত কমে আসে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শাশুড়ি নিজের মেয়ের পক্ষ নিয়ে বউকেই দোষী সাব্যস্ত করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় শাশুড়ির সাথে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে বরং সম্মান বজায় রেখে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করাটাই বেশি কার্যকর।
মর্যাদা রক্ষা করে সীমারেখা টানার উপায়
- প্রতিটা কটূক্তির জবাব তর্কে না গিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে দেওয়া — যেমন, "এই কথাটা আমার ভালো লাগে না, দয়া করে এভাবে বলবেন না"
- স্বামীর কাছে স্পষ্টভাবে বলা যে শুধু "পাত্তা না দেওয়া" যথেষ্ট নয়, তার সক্রিয় সমর্থন প্রয়োজন — তাকে বোনের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলা
- সম্ভব হলে আর্থিক ও ব্যবহারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আলাদা থাকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা, যা অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের সংঘাত কমিয়ে দেয়
- পরিবারের কোনো শ্রদ্ধেয় মুরব্বি বা ইমামকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিষয়টা জানানো, যাতে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তিনি বিষয়টা সমাধানে সাহায্য করতে পারেন
- নিজের মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদা অন্যের মন্তব্যের ওপর নির্ভরশীল না করে নিজের ভেতরে দৃঢ় রাখার চেষ্টা করা
এই পরিস্থিতিতে ধৈর্যের জন্য দোয়া করা যেতে পারে।
রাব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরান ওয়া ছাব্বিত আক্বদামানা — অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দাও এবং আমাদের পা দৃঢ় রাখো। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫০)
এই দোয়া মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, কিন্তু এর অর্থ যেকোনো কঠিন মানসিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক — নিজের মনের দৃঢ়তা বজায় রাখার জন্য এই দোয়া প্রতিদিন পড়া যায়। এছাড়া নিজেকে ছোট বা অসহায় মনে হলে মুসা আলাইহিস সালামের এই দোয়াও সান্ত্বনা দিতে পারে, যা তিনি নিঃসম্বল অবস্থায় পড়েছিলেন।
রাব্বি ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইয়্যা মিন খাইরিন ফাক্বীর — অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার জন্য যে কল্যাণই নাযিল করো না কেন, আমি তার জন্য মুখাপেক্ষী। (সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত ২৪)
কখন পেশাদার সাহায্য দরকার
যদি এই কটূক্তি ক্রমাগত চলতে থাকে এবং তার প্রভাবে বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, বা আত্মবিশ্বাসের চরম অভাব দেখা দেয়, তাহলে একজন মনোবিদের সাহায্য নেওয়া জরুরি। যদি স্বামী কোনোভাবেই স্ত্রীর পাশে দাঁড়াতে অস্বীকার করেন এবং এই অবহেলা সম্পর্কে গভীর ফাটল তৈরি করে, একজন ম্যারিজ কাউন্সেলর বা উভয় পরিবারের শ্রদ্ধেয় মুরব্বিদের নিয়ে পারিবারিক মধ্যস্থতার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটাও মনে রাখা জরুরি যে সবরের একটা সীমা আছে — যদি কটূক্তি মানসিক নির্যাতনের পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে শুধু সহ্য করে যাওয়া কোনো ইসলামি দায়িত্ব নয়।
অনেকে জিজ্ঞেস করেন, প্রতিবাদ করলে কি সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যাবে না। বাস্তবে দেখা যায়, প্রথমবার শান্তভাবে প্রতিবাদ করলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি একটু উত্তপ্ত হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যিনি নিজের সীমারেখা স্পষ্ট করে জানান, তাকে সাধারণত মানুষ পরে সম্মান করতে শেখে। যিনি সবকিছু নীরবে মেনে নেন, তার সীমারেখা বারবার পরীক্ষা করার প্রবণতাই বরং বেশি দেখা যায়।
নিশ্চয়তাহীন বাস্তবতা
প্রতিটা পরিবারের গতিশীলতা আলাদা, আর তাই একটা নির্দিষ্ট পদক্ষেপ সব পরিস্থিতিতে একইভাবে কাজ করবে এমন নিশ্চয়তা নেই। এখানে দেওয়া পরামর্শ কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আদব ও ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা মাত্র, পেশাদার কাউন্সেলিং বা পারিবারিক মধ্যস্থতার বিকল্প নয়। নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। কোনো তাবিজ বা তদবিরের মাধ্যমে ননদ বা শাশুড়ির মন পরিবর্তনের দাবি এখানে করা হচ্ছে না।
শেষ কথা
শ্বশুরবাড়ির কটূক্তি সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখা একটা কঠিন বাস্তবতা, কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও নিজের মর্যাদা রক্ষা করার পথ খোলা আছে। নীরবে সব মেনে নেওয়া আর সম্মানের সাথে সীমারেখা টানা — এই দুইয়ের মাঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্য বুঝেই একজন নারী তার মানসিক সুস্থতা রক্ষা করতে পারেন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- স্বামীর রাগের মাথায় তালাক শব্দ বলে ফেলা: করণীয় ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
- প্রবাসফেরত স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিতে না পারা ও স্ত্রীর স্বাধীনতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
- সন্তানেরা বড় হওয়ার পর দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি ও দূরত্ব
- স্বামীর মাদকাসক্তি বা জুয়ার নেশায় সংসার ধ্বংসের মুখে: স্ত্রীর করণীয়
- তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব ও ইসলামি নির্দেশনা
- বারবার গর্ভপাতের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ও মানসিক যন্ত্রণা
https://alshifa.bd/blog/sister-in-law-taunts-enduring-marriage