রুকইয়াহর সময় কান্না বা হাসি আসে কেন

রুকইয়াহর সময় কান্না বা হাসি আসে কেন

রুকইয়াহর সময় কান্না, হাসি বা কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়া নিয়ে যেসব ভুল ধারণা প্রচলিত, কুরআন-হাদিসের আলোকে সেগুলোর একটা বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া হলো।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

কান্না আসলেই যে ভেতরে জ্বিন আছে, আর হাসি পেলেই যে সব ঠিকঠাক আছে — এই দুটো ধারণাই ভুল। রুকইয়াহর সময় শরীর আর মন যেভাবে সাড়া দেয়, তার পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করে, আর সবগুলোকে এক ছাঁচে ফেলে বিচার করা যায় না।

কান্না পাওয়াটা প্রথমে বোঝা দরকার

কুরআন শোনার পর কান্না আসাটা নতুন কিছু না। সূরা বনী ইসরাইলের ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যাদের আগে থেকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা যখন কুরআন শোনে তখন থুতনি পর্যন্ত লুটিয়ে পড়ে কাঁদে। সূরা মারইয়ামের ৫৮ নম্বর আয়াতেও একই ছবি — আল্লাহর আয়াত শুনে সিজদায় লুটিয়ে পড়া আর কান্না। তাই অন্তর নরম হয়ে চোখ ভিজে ওঠাটা ঈমানের একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, জ্বিনের উপস্থিতির প্রমাণ না-ও হতে পারে। অনেক সময় এটা শুধুই জমে থাকা কষ্ট, চাপ, বা পুরনো কোনো দুঃখ বেরিয়ে আসার মতো একটা মানসিক মুক্তি।

হাসি বা অন্যরকম প্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্কতা দরকার

রুকইয়াহ চর্চার সঙ্গে যুক্ত অনেকে বলেন, কখনো কখনো ঠাট্টার মতো হাসি, হঠাৎ রাগ, বা নির্দিষ্ট কোনো আয়াতের প্রতি অস্বস্তি জ্বিনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো কথা না, তবে একটামাত্র প্রতিক্রিয়া দেখে তৎক্ষণাৎ "আপনার মধ্যে জ্বিন আছে" বলে দেওয়াটাও ঠিক না। মানুষ ভেদে স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া অনেক রকম হয় — ক্লান্তি, নার্ভাসনেস, এমনকি অস্বস্তিকর পরিবেশেও মানুষ অদ্ভুতভাবে হেসে ফেলে। তাই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সময় আর পর্যবেক্ষণ দুটোই দরকার।

একেকজনের প্রতিক্রিয়া একেকরকম হওয়ার পেছনে কারণ আছে

বয়স, শারীরিক অবস্থা, ঘুম কম হওয়া, মানসিক চাপ, এমনকি কেউ কোনো ওষুধ খাচ্ছেন কিনা — এসবও প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। যে মানুষ এমনিতেই আবেগপ্রবণ বা সহজে চোখে পানি চলে আসে তার প্রতিক্রিয়া একরকম, আর যে মানুষ চুপচাপ থাকতে অভ্যস্ত তার প্রতিক্রিয়া আরেকরকম। তাই পাশের চেয়ারে বসা কেউ কেঁদে ফেললে নিজের মধ্যে সেটা না হওয়ায় হীনম্মন্যতায় ভোগার কিছু নেই। এটা তুলনা করার বিষয় না।

কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়াটাও স্বাভাবিক

অনেকে সেশনে বসে থাকেন, কিছুই অনুভব করেন না, আর তারপর ভাবতে থাকেন হয়তো তার ঈমান দুর্বল বা তার সমস্যাটাই মিথ্যা। এই ভাবনা ভুল। শরীর প্রকাশ্যে কিছু না দেখালেও ভেতরে আয়াতের প্রভাব কাজ করতে পারে, আর আরোগ্য কখনো নাটকীয় দৃশ্যের মধ্য দিয়েই আসে না। সূরা যুমারের ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা তাদের রবকে ভয় করে তাদের গায়ের লোম শিহরিত হয়, তারপর তাদের শরীর আর অন্তর আল্লাহর স্মরণে নরম হয়ে আসে — অর্থাৎ প্রতিক্রিয়ার ধরনও একেকজনের কাছে একেকরকম, আর তা সময়ের সাথে বদলাতে পারে।

প্রতিক্রিয়া দেখে চিকিৎসার অগ্রগতি বিচার করবেন না

একজন হয়তো প্রথম সেশনেই খুব কেঁদে ফেললেন, আরেকজন কয়েক সেশন পার করেও তেমন কিছু অনুভব করলেন না। এর মানে এই না যে প্রথমজনের সমস্যা দ্রুত সারবে আর দ্বিতীয়জনের সারবে না। কান্না বা হাসি নিরাময়ের কোনো মাপকাঠি না, এটা শুধু ওই মুহূর্তে শরীর ও মনের একটা প্রকাশ মাত্র। প্রকৃত পরিবর্তন বোঝা যায় সময়ের সাথে দৈনন্দিন জীবনে, ঘুমে, মেজাজে আর সম্পর্কে কতটা স্বস্তি ফিরছে তা দিয়ে।

অন্যের সামনে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সংকোচ হলে

অনেকে দলগত সেশনে বা পরিবারের সামনে কেঁদে ফেলা নিয়ে লজ্জা পান। এটা নিয়ে বাড়তি চিন্তার কিছু নেই — যিনি রুকইয়াহ করাচ্ছেন তার কাছে এটা অস্বাভাবিক কোনো দৃশ্য না, বরং নিয়মিত দেখা একটা বিষয়। তারপরও একান্তে বসে সহজবোধ মনে হলে সেই অপশনও নেওয়া যায়।

যা করা উচিত না

নিজেকে জোর করে কাঁদানো, বা কান্না না এলে হতাশ হয়ে পড়া — দুটোই অনর্থক। প্রতিক্রিয়া দিয়ে নিজের ঈমান বা সমস্যার মাত্রা মাপার চেষ্টা করলে উল্টো মানসিক চাপ বাড়ে। সেশনে যা হওয়ার হবে, সেটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে শুধু মনোযোগ দিয়ে আয়াত শোনাটাই যথেষ্ট।

প্রশ্ন থাকলে সরাসরি জিজ্ঞেস করাই ভালো

নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ে দ্বিধা থাকলে সেটা লুকিয়ে না রেখে বুকিংয়ের সময় বা সেশনের ফাঁকে হুজুরকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো। ওয়েবসাইট থেকে সময় বুক করার পর পেমেন্ট সম্পন্ন হলে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যায়, সেখানে নিজের অভিজ্ঞতাটা খুলে বলা যায়।

"যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের গায়ের লোম শিহরিত হয়, তারপর তাদের শরীর ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত হয়ে আসে" (সূরা যুমার, আয়াত ২৩)। কান্না বা হাসি নয়, অন্তরের এই প্রশান্তির দিকে যাওয়াটাই আসল লক্ষ্য।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/crying-laughing-during-ruqyah-explained


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ