রুকইয়াহতে কোন সূরা-আয়াত সবচেয়ে বেশি পড়া হয় এবং কেন

রুকইয়াহতে কোন সূরা-আয়াত সবচেয়ে বেশি পড়া হয় এবং কেন

প্রতিটি রুকইয়াহ সেশনেই কিছু নির্দিষ্ট সূরা বারবার শোনা যায় - ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ফালাক-নাস। কেন এই আয়াতগুলোই বারবার ব্যবহৃত হয়, তার পেছনের কারণ ও ইতিহাস।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

বারবার একই আয়াত কেন

রুকইয়াহ সেশনে প্রথমবার যাওয়া অনেকেই লক্ষ্য করেন, রাকী প্রায় প্রতিটি সেশনেই একই কয়েকটা সূরা পড়েন - সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার শেষ অংশ, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস। প্রশ্ন জাগে, কুরআনে তো ছয় হাজারের বেশি আয়াত আছে, তাহলে কেন বারবার এই কয়েকটাই ব্যবহার করা হয়? এটা কি শুধু প্রচলন, নাকি এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ আছে?

উত্তরটা হলো, এই আয়াতগুলো নির্বাচনের পেছনে হাদিসে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট ঘটনা ও নবীজির নিজের অভ্যাস কাজ করেছে। এলোমেলোভাবে বেছে নেওয়া হয়নি, বরং প্রতিটির পেছনে একটা প্রেক্ষাপট আছে।

সূরা ফাতিহা - উম্মুল কিতাব যা বিষক্রিয়া সারিয়েছিল

আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদল সাহাবি সফরে এক গোত্রের কাছে গিয়ে আতিথেয়তা চাইলেন কিন্তু তারা অস্বীকার করল। এমন সময় সেই গোত্রের সরদারকে বিচ্ছু বা সাপ দংশন করল, আর তারা সাহাবিদের কাছে ঝাড়ফুঁকের সাহায্য চাইল। এক সাহাবি সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিলেন, আর সরদার সুস্থ হয়ে উঠলেন। বিনিময়ে তারা কিছু ছাগল দিল, যা নিয়ে সাহাবিরা দ্বিধায় পড়ে নবীজির কাছে জিজ্ঞেস করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে বললেন, তুমি কী করে জানলে যে এটা রুকইয়াহ, তারপর সেই ছাগল ভাগ করে নেওয়ার অনুমতি দিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭৪৯)

এই ঘটনা প্রমাণ করে সূরা ফাতিহা যে শুধু নামাজের সূরা তা নয়, বরং এটি নিজেই একটা স্বীকৃত রুকইয়াহ। এতে আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর একক ইবাদত ও একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়ার ঘোষণা আছে - ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন, যা প্রতিটি সংকটেই প্রাসঙ্গিক।

আয়াতুল কুরসি - কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যে এটাকে কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত বলা হয়। এতে আল্লাহর জীবিত থাকা, সবকিছুর ধারক হওয়া, তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ না করা, আকাশ-জমিনের সবকিছুর ওপর তাঁর কর্তৃত্ব থাকার কথা বলা হয়েছে। যেহেতু জিন-শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষা মূলত আল্লাহর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরতা থেকেই আসে, তাই এই আয়াতটি রুকইয়াহতে কেন্দ্রীয় স্থান পায়। ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়ার বিশেষ ফজিলতও হাদিসে বর্ণিত আছে, যেখানে শয়তান নিজেই স্বীকার করেছিল এই আয়াতের সুরক্ষার কথা।

সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত

আমানার রাসুলু থেকে শুরু হওয়া সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতে ঈমানের মূল বিষয়বস্তু, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও সাহায্য চাওয়ার প্রার্থনা আছে। রাব্বানা লা তুআখিযনা ইন নাসিনা আও আখতা'না - হে আমাদের রব, আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের পাকড়াও করবেন না। এই আয়াতগুলো আত্মিক শক্তি ও নির্ভরতার একটা পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা বহন করে, যা রুকইয়াহর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

মুআওবিযাতাইন - ফালাক ও নাস

সূরা ফালাক ও সূরা নাস - এই দুটি সূরাকে একসাথে মুআওবিযাতাইন বলা হয়, অর্থাৎ আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা। সূরা ফালাকে সৃষ্টির অনিষ্ট, অন্ধকার রাতের অনিষ্ট, গিঁটে ফুঁ দেওয়া জাদুকরদের অনিষ্ট এবং হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। সূরা নাসে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। জাদু ও জিনের প্রভাব মোকাবিলায় সরাসরি প্রাসঙ্গিক হওয়ায় এই দুই সূরা প্রতিটি রুকইয়াহ সেশনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

সূরা ইখলাস - তাওহীদের ঘোষণা

সূরা ইখলাসে আল্লাহর একত্ববাদের সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা আছে - তিনি এক, অমুখাপেক্ষী, তাঁর কোনো সন্তান নেই, তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। যেহেতু শিরকমুক্ত থাকাটাই রুকইয়াহর প্রথম শর্ত, তাই তাওহীদের এই ঘোষণা সেশনের একটা কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে পড়া হয়।

অন্যান্য আয়াত যা প্রসঙ্গভেদে ব্যবহৃত হয়

এই মূল আয়াতগুলো ছাড়াও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আরও কিছু আয়াত ব্যবহার করা হয়।

  • সূরা ইউনুসের ৫৭ নম্বর আয়াত, যেখানে কুরআনকে অন্তরের রোগের আরোগ্য বলা হয়েছে
  • সূরা ইসরার ৮২ নম্বর আয়াত, মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমতের কথা
  • সূরা আরাফের ১১৭ থেকে ১২২ আয়াত, মূসা আলাইহিস সালামের সামনে জাদুকরদের জাদু বাতিল হওয়ার ঘটনা
  • সূরা ত্বহার ৬৯ নম্বর আয়াত, জাদুকরের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার বর্ণনা

এই আয়াতগুলো বিশেষভাবে জাদুর প্রভাব মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়, কারণ এগুলোতে সরাসরি জাদু বাতিল হওয়ার ঘটনা বর্ণিত আছে।

এই নির্দিষ্ট আয়াতগুলোর পেছনের যুক্তি

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রতিটি নির্বাচিত আয়াত বা সূরা একটা নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বহন করে - আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, তাঁর একত্ববাদ, সুরক্ষা প্রার্থনা, আর জাদু-শয়তানের প্রভাব বাতিল হওয়ার ঘোষণা। এলোমেলো কোনো আয়াত না বেছে বিষয়বস্তুভিত্তিক নির্বাচনের কারণেই এই আয়াতগুলো এত ঘন ঘন ব্যবহৃত হয়।

যেকোনো আয়াত কি ব্যবহার করা যায়

নীতিগতভাবে কুরআনের যেকোনো আয়াত দিয়েই রুকইয়াহ করা যায়, কারণ পুরো কুরআনই আরোগ্য ও রহমত। তবে যে আয়াতগুলোর ব্যাপারে হাদিসে সুনির্দিষ্ট বর্ণনা আছে বা যেগুলোর বিষয়বস্তু সরাসরি সুরক্ষা ও তাওহীদের সাথে সম্পর্কিত, সেগুলো অগ্রাধিকার পায়। নতুন কেউ রুকইয়াহ শিখতে চাইলে এই কয়েকটা মূল সূরা-আয়াত দিয়েই শুরু করা সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর, কারণ এগুলো ছোট, মুখস্থ করা সহজ, আর প্রতিটির অর্থও স্পষ্ট।

এটি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দিকনির্দেশনা, কোনো পাল্টা জাদু, তাবিজ, বা তদবির শাস্ত্রের বই থেকে নেওয়া কোনো আমল নয়। কোন আয়াত পড়া হচ্ছে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থ বুঝে, বিশ্বাস নিয়ে ও আন্তরিকতার সাথে পড়া - কারণ চূড়ান্ত আরোগ্য আয়াতের সংখ্যা বা নির্বাচনে নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

যারা রুকইয়াহ শিখতে চান বা নিজের জন্য একটা সহজ শুরুর বিন্দু খুঁজছেন, তাদের জন্য এই মূল সূরাগুলো ভালোভাবে মুখস্থ করে অর্থসহ বোঝাটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/most-used-surahs-in-ruqyah


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ