নিজে নিজে রুকইয়াহ করবেন কীভাবে - ধাপে ধাপে সঠিক পদ্ধতি

নিজে নিজে রুকইয়াহ করবেন কীভাবে - ধাপে ধাপে সঠিক পদ্ধতি

সবসময় রাকীর কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না। নিজে নিজে রুকইয়াহ করার সঠিক ধাপ, কোন আয়াত কীভাবে পড়বেন, আর কখন সেলফ-রুকইয়াহ যথেষ্ট নয় তার একটা বাস্তব গাইড।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

রাত জেগে একা লড়াই করা মানুষটির প্রশ্ন

রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে বুকের ওপর একটা চাপ অনুভব করেন অনেকে, শরীর নাড়াতে পারেন না, মনে হয় কেউ যেন চেপে ধরে আছে। এই মুহূর্তে হাতের কাছে কোনো রাকী নেই, ফোন করার মতো অবস্থাও নেই। তখন একজন মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠে নিজের জানা কয়েকটা আয়াত। প্রশ্ন হলো, রাকী ছাড়া নিজে নিজে রুকইয়াহ করা যায় কি, আর করলে কীভাবে করতে হয় - এই প্রশ্নটা প্রতিদিন বহু মানুষ করেন, বিশেষত যারা প্রবাসে থাকেন বা যাদের কাছাকাছি নির্ভরযোগ্য রাকী নেই।

উত্তরটা হলো, হ্যাঁ, ব্যক্তি নিজের ওপর নিজে রুকইয়াহ করতে পারেন, এবং এটা শুধু অনুমোদিতই নয়, বরং সুন্নাহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটা অভ্যাস। তবে এর একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা আছে, যা জানা থাকলে অনেক বেশি উপকার পাওয়া যায়।

নবীজি নিজেও নিজের ওপর রুকইয়াহ করতেন

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থ হতেন, তখন নিজেই মুআওবিযাত অর্থাৎ সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে নিজের হাতে ফুঁ দিতেন এবং সেই হাত দিয়ে নিজের শরীর মাসাহ করতেন। পরবর্তীতে যখন তাঁর অসুস্থতা তীব্র হয়ে ওঠে, তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজে তাঁর জন্য এই আয়াতগুলো পড়ে তাঁরই হাত দিয়ে শরীর মাসাহ করাতেন, কারণ তাঁর হাতে যে বরকত ছিল তা অন্য কারো হাতে ছিল না। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৭২৮)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নিজের ওপর নিজে রুকইয়াহ করা শুধু অনুমোদিত নয়, বরং নবীজির নিজের অভ্যাস ছিল। তাই কোনো মুসলিমের এটা ভাবার কারণ নেই যে রুকইয়াহর জন্য সবসময় অন্য কারো সাহায্য অপরিহার্য।

প্রস্তুতি - অজু, নিয়ত ও পরিবেশ

সেলফ-রুকইয়াহ শুরু করার আগে অজু করে নেওয়া উত্তম, যদিও অজু ছাড়াও পড়া যায়। একটা শান্ত জায়গা বেছে নিন যেখানে মনোযোগ বিঘ্নিত হবে না - ঘরের দরজা বন্ধ করে, মোবাইল সাইলেন্ট রেখে বসুন। নিয়ত করুন যে এই তিলাওয়াত আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়ার জন্য, কোনো লোক দেখানোর জন্য নয়। বসে বা শুয়ে যেভাবে সুবিধা সেভাবে পড়া যায়, তবে সচেতন থাকা জরুরি যাতে ঘুমিয়ে না পড়েন।

ধাপ ১: সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু

সূরা ফাতিহাকে বলা হয় উম্মুল কুরআন, আর এতে এমন একটা আয়াত আছে যা প্রতিদিন অন্তত সতেরো বার নামাজে পড়া হয় - ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা'ঈন, অর্থাৎ আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই। ধীরে ধীরে অর্থ বুঝে সূরা ফাতিহা পড়ুন, তারপর নিজের হাতে ফুঁ দিয়ে মুখ, বুক ও শরীরে মাসাহ করুন।

ধাপ ২: আয়াতুল কুরসি ও সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত

এরপর আয়াতুল কুরসি পড়ুন - এটি কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হিসেবে পরিচিত এবং সুরক্ষার আয়াত হিসেবে সুপরিচিত। এরপর সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত আমানার রাসুলু থেকে শুরু করে সূরার শেষ পর্যন্ত পড়ুন। প্রতিটি আয়াতের পর কিছুক্ষণ থামুন, অর্থ নিয়ে চিন্তা করুন, তারপর পরের আয়াতে যান।

ধাপ ৩: মুআওবিযাতাইন ও সূরা ইখলাস

সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস - এই তিনটি সূরা তিনবার করে পড়ুন। প্রতিবার পড়া শেষে নিজের দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিন এবং হাত দিয়ে মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে শরীরের যতটুকু সম্ভব অংশে মাসাহ করুন। যেসব জায়গায় ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করেন, সেখানে বিশেষভাবে হাত রাখুন এবং কয়েকবার আয়াতগুলো পুনরাবৃত্তি করুন।

পানি বা তেলে পড়ে ব্যবহার করা

একটা পাত্রে পানি নিয়ে এই আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই পানি পান করা এবং শরীরে লাগানোও রুকইয়াহর একটা স্বীকৃত পদ্ধতি। যাদের সরাসরি নিজের ওপর তিলাওয়াতে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়, তাদের জন্য এই পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে - পানি পান করার সময় ও শরীরে মাখার সময় আয়াতের বরকত পাওয়ার নিয়তে করলে তা উপকারী।

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেলফ-রুকইয়াহ কীভাবে প্রয়োগ করবেন

সবার প্রয়োজন এক রকম নয়, তাই পরিস্থিতিভেদে কিছুটা ভিন্নভাবে এগোনো যায়। রাতে ঘুমানোর আগে সুরক্ষার জন্য উপরের পুরো রুটিনটা পড়ে বিছানায় ফুঁ দিয়ে শোয়া উত্তম, বিশেষত যাদের রাতে অস্থির লাগে বা দুঃস্বপ্ন দেখেন তাদের জন্য এটা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। শরীরের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করলে সেই জায়গায় সরাসরি হাত রেখে আয়াতগুলো কয়েকবার পড়া যায়, প্রতিবার ফুঁ দিয়ে হাত দিয়ে মৃদু চাপ দেওয়া যায়। যাদের মনে বারবার খারাপ চিন্তা বা ওয়াসওয়াসা আসে, তাদের জন্য সূরা নাস বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এতে সরাসরি মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে - এক্ষেত্রে দিনের মধ্যে যতবার এমন চিন্তা আসে ততবার চুপিচুপি সূরাটা আউড়ানো অভ্যাস করা যায়।

সাধারণ যেসব ভুল মানুষ সেলফ-রুকইয়াহতে করেন

নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে গিয়ে অনেকে কিছু সাধারণ ভুল করে বসেন, যা ফলাফল কমিয়ে দেয় বা ভুল প্রত্যাশা তৈরি করে।

  • তাড়াহুড়ো করে দ্রুত আয়াত পড়ে ফেলা, অর্থ নিয়ে চিন্তা না করা
  • শুধু চরম অস্থিরতার মুহূর্তে মনে পড়লে পড়া, নিয়মিত অভ্যাস না গড়ে তোলা
  • একবার-দুইবার পড়ে তাৎক্ষণিক জাদুকরী ফলাফল আশা করা
  • ইউটিউবে অযাচাইকৃত "বিশেষ জিন তাড়ানোর আয়াত" শীর্ষক ভিডিও অনুসরণ করা, যেখানে অনেক সময় নাটকীয় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা অপ্রমাণিত দাবি যুক্ত থাকে
  • রুকইয়াহর পাশাপাশি জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন - যেমন নামাজ নিয়মিত করা, পাপ কাজ থেকে দূরে থাকা - এসব উপেক্ষা করা

শুদ্ধ উচ্চারণে আয়াত পড়ার চেষ্টা করা ভালো, তবে উচ্চারণে সামান্য ত্রুটি হলে থেমে যাওয়ার দরকার নেই - আন্তরিকতা নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াটাই মুখ্য। যাদের আরবি পড়তে অসুবিধা হয়, তারা শুরুতে বাংলা উচ্চারণ দেখে দেখে পড়তে পারেন, তবে ধীরে ধীরে সঠিক তাজবিদ শেখার চেষ্টা করা উচিত।

রেকর্ড করা তিলাওয়াত শোনা কি নিজে পড়ার সমতুল্য

যারা আরবি পড়তে পারেন না বা মুখস্থ আয়াতের সংখ্যা কম, তাদের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য ক্বারীর তিলাওয়াত শোনাও একেবারে অকার্যকর নয়, বিশেষত মনোযোগ দিয়ে অর্থ অনুধাবন করে শুনলে। তবে নিজে উচ্চারণ করে পড়া ও নিজের হাতে ফুঁ দিয়ে মাসাহ করার মধ্যে যে ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি হয়, তা শুধু শোনার মধ্যে পাওয়া যায় না। তাই যতটা সম্ভব নিজে তিলাওয়াত শেখার চেষ্টা করা উচিত, আর শোনার ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে রেকর্ডিং বেছে নেওয়া উচিত, এলোমেলো কোনো চ্যানেলের ভিডিও নয় যেখানে ভুল উচ্চারণ বা সন্দেহজনক সংযোজন থাকতে পারে।

কতদিন, কতবার করবেন

সেলফ-রুকইয়াহ একবার করেই থেমে যাওয়ার জিনিস নয়। যারা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য প্রতিদিন অন্তত একবার, সম্ভব হলে সকালে ও রাতে দুইবার এই রুটিন করা উপকারী। ধারাবাহিকতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ - এক-দুই দিন করে ছেড়ে দিলে তেমন ফল আশা করা ঠিক না, বরং সপ্তাহ-দুয়েক নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার পর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় অনেকের ক্ষেত্রে।

মনোযোগ ও বিশ্বাস কেন গুরুত্বপূর্ণ

শুধু যান্ত্রিকভাবে আয়াত আউড়ে গেলে তেমন উপকার পাওয়া যায় না। আয়াতের অর্থ বুঝে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে, আন্তরিকভাবে আরোগ্য চাওয়ার মানসিকতা নিয়ে পড়াটাই আসল কাজ করে। অনেকে দ্রুত শেষ করার তাড়ায় দ্রুতগতিতে আয়াত পড়ে ফেলেন, যা কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

সেলফ-রুকইয়াহ কখন যথেষ্ট নয়

নিজে নিজে রুকইয়াহ করা একটা চমৎকার নিয়মিত অভ্যাস, তবে এটা সব পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। যদি সমস্যা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে ব্যক্তি নিজে সচেতনভাবে তিলাওয়াত করতে পারছেন না, শরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, বা দীর্ঘদিন ধরে নিজে চেষ্টা করেও কোনো উন্নতি হচ্ছে না, তখন একজন অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য রাকীর সাহায্য নেওয়া দরকার। বিশেষভাবে নারীদের ক্ষেত্রে মাহরাম বা নারী রাকীর মাধ্যমে সেশন করানোর বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি।

যাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা - যেমন তীব্র বিষণ্নতা, আত্মহত্যার চিন্তা, বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ আছে, তাদের জন্য শুধু সেলফ-রুকইয়াহর ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। রুকইয়াহ আধ্যাত্মিক দিক থেকে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটা চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তার বিকল্প নয়।

এটি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দিকনির্দেশনা, কোনো পাল্টা জাদু, তাবিজ, বা তদবির শাস্ত্রের বই থেকে নেওয়া কোনো আমল নয়; চূড়ান্ত আরোগ্য একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। কেউ নিয়মিত সেলফ-রুকইয়াহ করলেও তাৎক্ষণিক ফলাফল না পেলে হতাশ হওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রতিটি মানুষের অবস্থা ও আল্লাহর সিদ্ধান্ত ভিন্ন।

যাদের কাছে এখনো নির্ভরযোগ্য রাকী পৌঁছানো কঠিন, তাদের জন্য এই ধাপগুলো ধরে ধরে নিয়মিত অনুশীলন করাই একটা বাস্তবসম্মত শুরু। ধৈর্য নিয়ে, আন্তরিকতার সাথে চালিয়ে গেলে অনেকেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন অনুভব করেন, আর প্রয়োজন হলে যোগ্য কারো সাহায্য নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/self-ruqyah-step-by-step-method


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ