
রুকইয়াহ সেশনের আগে যেভাবে প্রস্তুতি নেবেন
প্রথমবার রুকইয়াহ সেশনে বসার আগে অজু, পোশাক, তাবিজ-মাদুলি আর মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যেসব প্রশ্ন সবার মনে ঘোরে, তার সহজ ও বাস্তবসম্মত উত্তর এখানে দেওয়া হলো।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
কাল সকালে প্রথমবারের মতো রুকইয়াহর অ্যাপয়েন্টমেন্ট। রাত থেকেই মনে একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে — অজু করে যেতে হবে কিনা, গায়ে যদি কোনো মাদুলি বা তাবিজ থাকে সেটা খুলে ফেলতে হবে কিনা, নাকি খালি পেটে থাকাই ভালো। এমন দ্বিধা প্রায় প্রত্যেকের প্রথম সেশনের আগে হয়। খুশির খবর হলো, এর বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর আসলে খুব জটিল কিছু না।
শরীর, পোশাক আর রোজা নিয়ে বাড়াবাড়ির দরকার নেই
অজু অবস্থায় থাকা ভালো, কারণ অজু নিজেই একধরনের প্রস্তুতি — শরীর আর মন দুটোকেই পরিষ্কার রাখে। তবে এটা কোনো শর্ত না যে অজু ছাড়া সেশন হবে না। পোশাক নিয়েও একই কথা — শালীন, ঢিলেঢালা, স্বাভাবিক পোশাক পরে এলেই যথেষ্ট, বিশেষ কোনো সাদা কাপড় বা আলাদা কোনো "রুকইয়াহ ড্রেস কোড" বলে কিছু নেই। অনেকে মনে করেন রোজা রেখে না গেলে রুকইয়াহ কাজ করবে না — এই ধারণারও ভিত্তি নেই। রোজা একটা নফল ইবাদত হতে পারে, কিন্তু রুকইয়াহর পূর্বশর্ত না। খালি পেটে বা ভরপেটে, যেকোনো অবস্থাতেই সেশনে বসা যায়।
মনের প্রস্তুতিটাই আসল কাজ
রুকইয়াহ মূলত কুরআনের আয়াত আর দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়া। সূরা বনী ইসরাইলের ৮২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, কুরআন থেকে তিনি এমন কিছু নাযিল করেন যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত। সূরা ইউনুসের ৫৭ নম্বর আয়াতেও একই কথা এসেছে — কুরআন অন্তরের রোগের জন্য শিফা। তাই সেশনে বসার আগে মনে এই বিশ্বাসটা দৃঢ় রাখা জরুরি যে আরোগ্য দেন একমাত্র আল্লাহ, রুকইয়াহ পাঠকারী শুধু মাধ্যম মাত্র। সন্দেহ বা "দেখি তো কাজ হয় কিনা" গোছের পরীক্ষা করার মানসিকতা নিয়ে এলে ফল আসতে সময় লাগে, কারণ তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসাটাই এখানে মূল ভিত্তি।
গায়ে তাবিজ বা মাদুলি থাকলে
কুরআনের আয়াত ছাড়া অন্য কিছু লেখা তাবিজ, সুতা বা মাদুলি সঙ্গে থাকলে সেশনের আগে খুলে ফেলা উচিত। হাদিসে এসেছে, জাহেলি যুগে মানুষ যেসব রুকইয়াহ করত তা নবিজি (সা.)-কে শোনানো হলে তিনি বলেছিলেন, শিরক না থাকলে রুকইয়াহতে কোনো সমস্যা নেই (সহীহ মুসলিম, আওফ ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত)। অর্থাৎ যা কিছু আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শক্তির অংশীদার বানায়, তা রুকইয়াহর পরিবেশে থাকা ঠিক না। এটা সন্দেহের কিছু না, বরং একটা পরিষ্কার নীতিমালা, আর নিজের ঘরেও এই একই নীতি মেনে চলা ভালো।
প্রথম সেশনে নিজের কথা কীভাবে গুছিয়ে বলবেন
সমস্যাটা যত স্পষ্ট করে বলা যায়, সেশন তত গোছানো হয়। কবে থেকে সমস্যা শুরু হয়েছে, ঘুমে কেমন প্রভাব পড়ছে, আগে অন্য কোনো টোটকা বা ঝাড়ফুঁক করানো হয়েছিল কিনা, ডাক্তার দেখানো হয়েছে কিনা বা কোনো ওষুধ চলছে কিনা — এই তথ্যগুলো আগে থেকে মনে গুছিয়ে রাখলে সুবিধা হয়। লুকোছাপা না করে যতটা সম্ভব খোলাখুলি বলাই ভালো, কারণ অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
সন্তান বা পরিবারের কারো জন্য বুকিং করলে
নিজের জন্য না হয়ে সন্তান বা পরিবারের অন্য কারো জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলে সেই ব্যক্তির বয়স, উপসর্গ আর আচরণের পরিবর্তনগুলো যতটা নির্দিষ্ট করে বলা যায়, ততই সুবিধা হয়। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মা-বাবাই মূল তথ্যদাতা হন, তাই ঘুম, খাওয়াদাওয়া বা আচরণে কী পরিবর্তন এসেছে তা আগে থেকে গুছিয়ে রাখা ভালো, যাতে সেশনে গিয়ে হুট করে কিছু মনে করার চেষ্টা করতে না হয়।
সেশনে কী হতে পারে, সেটা নিয়ে আগেভাগে জেনে রাখা ভালো
কারো কারো কান্না পায়, কারো শরীর ভারী লাগে, কারো আবার তেমন কিছুই মনে হয় না। তিনটে অবস্থাই স্বাভাবিক। তাই সেশনে ঢোকার আগে থেকে নাটকীয় কিছু আশা করে বসে থাকার দরকার নেই — প্রতিক্রিয়া হলো মানেই কাজ হচ্ছে, আর না হলে হচ্ছে না, এই হিসাব ভুল। মূল লক্ষ্য শান্ত মনে বসে আয়াত শোনা আর দোয়া করা।
একাধিক সেশন লাগতে পারে, এই বাস্তবতাটা মাথায় রাখুন
অনেকে ভাবেন একটা সেশনেই পুরোপুরি সমাধান হয়ে যাবে। বাস্তবে সমস্যার ধরন আর গভীরতা অনুযায়ী একাধিক সেশনের প্রয়োজন হতে পারে। এটা ব্যর্থতার লক্ষণ না, বরং স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। তাই প্রথম সেশনের পরপরই পুরোপুরি পরিবর্তন আশা করে বসে থাকলে অহেতুক হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ধৈর্য ধরে নিয়মিত আমল চালিয়ে যাওয়াটাই বাস্তবসম্মত পথ।
বুকিং আর সময় নিয়ে যা জেনে রাখা দরকার
ওয়েবসাইট থেকে সুবিধামতো সময় বেছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া যায়। নিয়মিত সেশনের ফি ৪৯৯ টাকা, আর রাত ৭টা থেকে ১১টার মধ্যে জরুরি প্রয়োজনে বসতে চাইলে ফি ৯৯৯ টাকা। পেমেন্ট বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে করা যায়, আর পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পরই হুজুরের সাথে সরাসরি যোগাযোগের নম্বর দেওয়া হয়। তাই বুকিংয়ের সময় নিজের সমস্যাটা যতটা স্পষ্ট করে লেখা যায়, সেশন ততটাই গোছানো হয়।
জিবরাঈল (আ.) অসুস্থ অবস্থায় নবিজি (সা.)-কে যে রুকইয়াহ শিখিয়েছিলেন তার একাংশ এমন — "আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি, প্রত্যেক ক্ষতিকর জিনিস থেকে, প্রতিটি হিংসুক চোখের অনিষ্ট থেকে, আল্লাহই তোমাকে সুস্থ করুন" (সহীহ মুসলিম)। প্রস্তুতি মানে এই কথাগুলোর ওপর ভরসা রেখে শান্ত মনে বসা, আর কিছু না।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- রুকইয়াহ সেশনে কান্না, কাঁপুনি বা ঘুম পাওয়া - স্বাভাবিক নাকি বিপদের লক্ষণ
- নিজে নিজে রুকইয়াহ করবেন কীভাবে - ধাপে ধাপে সঠিক পদ্ধতি
- রুকইয়াহতে কোন সূরা-আয়াত সবচেয়ে বেশি পড়া হয় এবং কেন
- ভালো ও খারাপ স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য ইসলামের দৃষ্টিতে কীভাবে বুঝবেন
- দলগত রুকইয়াহ নাকি একক — কোনটা বেশি কার্যকর
- রুকইয়াহর সময় কান্না বা হাসি আসে কেন