নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্য সুরক্ষার দোয়া ও আমল

নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্য সুরক্ষার দোয়া ও আমল

নতুন বিবাহিত দম্পতিদের জন্য বাসর রাতের সুন্নাহভিত্তিক দোয়া, বদনজর ও জাদু থেকে সুরক্ষার আমল, এবং সম্পর্কের প্রথম বছরে ভিত্তি মজবুত করার বাস্তব ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশনা।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

বিয়ের রাতে সাজানো ঘরে ঢুকে তানভীর একটু থমকে দাঁড়ালেন। এতদিন যাকে শুধু ছবিতে বা পরিবারের আলোচনায় জেনেছেন, এখন তিনিই তার জীবনসঙ্গী, ঘোমটার আড়ালে বসে আছেন খাটের কোণে। বাইরে তখনো আত্মীয়স্বজনের হাসাহাসি, গানের আওয়াজ। এই মুহূর্তে বেশিরভাগ নতুন বর যা করেন — নার্ভাস হাসি, আড়ষ্ট কথাবার্তা — তানভীরও তাই করলেন। কিন্তু তার নানা তাকে আগেই একটা কথা শিখিয়ে দিয়েছিলেন, যা অনেক পরিবারেই এখন হারিয়ে যাচ্ছে — বাসর রাতে স্ত্রীর কপালে হাত রেখে একটা দোয়া পড়ার সুন্নাহ। এই ছোট্ট অভ্যাসটাই আসলে একটা নতুন সংসারের প্রথম আধ্যাত্মিক ভিত্তি, যা পরবর্তী কয়েক দশকের সম্পর্কের সুর বেঁধে দিতে পারে।

নতুন বিয়ে মানেই শুধু আনন্দ আর উদযাপন না — এটা এমন একটা সময় যখন দুটো মানুষ, দুটো পরিবার, দুটো ভিন্ন অভ্যাস একসাথে বসবাস শুরু করে। এই সন্ধিক্ষণে আধ্যাত্মিক সুরক্ষার একটা ভিত্তি তৈরি করা ভবিষ্যতের অনেক সমস্যা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে, ঠিক যেমন একটা বাড়ির ভিত্তি মজবুত হলে পরবর্তী ঝড়-বৃষ্টি সামলানো সহজ হয়।

বাসর রাতের সুন্নাহভিত্তিক আমল

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামীকে নববধূর কপালে হাত রেখে একটা নির্দিষ্ট দোয়া পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি — অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ এবং তার যে স্বভাবের ওপর তাকে সৃষ্টি করেছেন সেই স্বভাবের কল্যাণ চাই, আর আমি আপনার কাছে তার অনিষ্ট এবং তার স্বভাবের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই। (সুনানে আবু দাউদ)

এই দোয়ার গভীরতা লক্ষ করার মতো — এখানে স্ত্রীকে নিখুঁত ভাবার দাবি করা হচ্ছে না, বরং তার ভালো ও মন্দ দুই দিক মেনে নিয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা হচ্ছে। এটাই বাস্তবসম্মত দাম্পত্য জীবনের প্রথম শিক্ষা — সঙ্গীকে কল্পনার মানুষ নয়, বাস্তব মানুষ হিসেবে গ্রহণ করা। এরপর উভয়ে একসাথে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া উত্তম, যা নতুন জীবনের শুরুটা আল্লাহর স্মরণ দিয়ে করার একটা সুন্দর অভ্যাস।

কেন নতুন দম্পতিরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ

বিয়ে একটা বড় ও প্রকাশ্য আনন্দের ঘটনা, যা স্বাভাবিকভাবেই অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে — গায়েহলুদ থেকে বৌভাত পর্যন্ত প্রতিটা অনুষ্ঠানে শত শত মানুষ নতুন দম্পতিকে দেখেন, ছবি তোলেন, প্রশংসা করেন। এই কারণে বদনজরের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে হিংসা বা প্রত্যাখ্যাত সম্পর্ক থেকে জাদুর ঝুঁকিও থাকতে পারে, বিশেষত যদি বিয়ের আগে কোনো জটিলতা ছিল — কারো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, বা পরিবারের মধ্যে কোনো পুরনো বিরোধ ছিল। এসব কারণে অনেক পরিবারে দেখা যায়, বিয়ের কিছুদিন পরই নতুন দম্পতির মধ্যে অকারণ মনোমালিন্য, একজনের হঠাৎ অসুস্থতা বা সংসারে অস্থিরতা দেখা দেয়।

শ্বশুরবাড়ির সাথে প্রথম মাসগুলোর মানিয়ে নেওয়া

নতুন বউ হিসেবে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করা মানে শুধু একজন মানুষের সাথে না, একটা পুরো পরিবারের নিয়মকানুন, অভ্যাস আর প্রত্যাশার সাথে মানিয়ে নেওয়া। প্রথম কয়েক মাসে শাশুড়ি-ননদের সাথে ছোটখাটো মতের অমিল হওয়াটা প্রায় প্রতিটা পরিবারেই স্বাভাবিক। এই সময় স্বামীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ — স্ত্রীকে একা এই নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না দিয়ে সেতুবন্ধনের কাজ করা, দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হলে দ্রুত স্পষ্ট করে দেওয়া। নতুন স্ত্রীর জন্যও এই সময় ধৈর্য ধরে পরিবারের রীতিনীতি বোঝার চেষ্টা করা, একইসাথে নিজের প্রয়োজনীয় সীমারেখাগুলো বিনয়ের সাথে জানিয়ে দেওয়া জরুরি। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে পরবর্তী বছরগুলোতে শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক অনেক মজবুত হয়।

প্রথম বছরের সুরক্ষামূলক আমল

  • উভয়ে নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যা মু'আউবিযাতাইন ও আয়াতুল কুরসি পাঠ করুন
  • নতুন সংসারে প্রবেশের সময় সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুলুন, কারণ এই সূরা নিয়মিত তেলাওয়াত হওয়া ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায় বলে হাদিসে এসেছে
  • বিয়ের অনুষ্ঠান ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত প্রকাশ না করে সংযত রাখুন
  • প্রশংসা শুনলে নিজেরাই "আলহামদুলিল্লাহ" বলার অভ্যাস করুন, প্রশংসার জবাবে গর্ব নয়, শোকর প্রকাশ করুন

বিয়ের পরপর আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা নতুন দম্পতির জন্য একটা বিশেষ দোয়া পড়েন, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সাহাবীদের বিয়েতে পড়তেন।

বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামা'আ বাইনাকুমা ফি খাইর — অর্থ: আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার ওপর বরকত বর্ষণ করুন, এবং তোমাদের দুজনকে কল্যাণের মধ্যে একত্র রাখুন। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযি, সুনানে ইবনে মাজাহ)

এই দোয়াটা শুধু বিয়ের দিন একবার শোনার জন্য না — নতুন দম্পতি নিজেরাও একে অপরের জন্য নিয়মিত এই দোয়া করতে পারেন, বিশেষ করে প্রথম বছরের কঠিন মানিয়ে নেওয়ার সময়গুলোতে।

সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করা

শুরু থেকেই খোলামেলা যোগাযোগ, একে অপরের পরিবারের প্রতি সম্মান এবং নিয়মিত একসাথে ইবাদতের অভ্যাস তৈরি করুন। বিয়ের প্রথম কয়েক মাসে দুজনের অভ্যাস, প্রত্যাশা আর সীমারেখা নিয়ে আলোচনা করাটা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু এই আলোচনা যত আগে হয়, পরবর্তী জীবনে ভুল বোঝাবুঝি তত কম হয়। ছোট বিষয়ে ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার অভ্যাস প্রথম থেকেই গড়ে তুললে ভবিষ্যতের অনেক দ্বন্দ্ব এড়ানো যায় — নতুন সংসারে টুথপেস্টের ঢাকনা খোলা রাখা থেকে শুরু করে শ্বশুরবাড়ি কতবার যাওয়া হবে, এসব ছোট ছোট বিষয়েই বেশিরভাগ প্রথম বছরের ঝগড়া শুরু হয়।

মানিয়ে নেওয়ার সময়টা স্বাভাবিক অস্বস্তির

এটা মনে রাখা জরুরি, বিয়ের পরপরই প্রতিটা মুহূর্ত রূপকথার মতো সুন্দর হবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত না। দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ হঠাৎ এক ছাদের নিচে জীবন শুরু করলে প্রথম কয়েক মাস কিছুটা আড়ষ্টতা, ছোটখাটো মতের অমিল থাকাটাই স্বাভাবিক। এটাকে ব্যর্থতার লক্ষণ না ভেবে বরং একে অপরকে জানার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। অনেক নতুন দম্পতি জিজ্ঞেস করেন, বিয়ের কতদিন পর পর্যন্ত এই আড়ষ্টতা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া যায়। এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, তবে যদি ছয় মাস থেকে এক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও কোনো মানসিক সংযোগ তৈরি না হয়, তখন বিষয়টা নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা এবং প্রয়োজনে বাইরের সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবা উচিত।

কখন পেশাদার সাহায্য প্রয়োজন

যদি বিয়ের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই গভীর অসামঞ্জস্য, ক্রমাগত সন্দেহ, বা কোনো একপক্ষের পরিবার থেকে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ সম্পর্ককে ভারাক্রান্ত করে তোলে, তাহলে দেরি না করে একজন ম্যারিজ কাউন্সেলর বা পারিবারিকভাবে শ্রদ্ধেয় কোনো মুরব্বির সাহায্য নেওয়া উচিত। প্রথম বছরেই সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করলে তা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় রূপ নেওয়ার আগেই সামলানো সম্ভব হয়।

নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এখানে দেওয়া আমল ও দোয়া পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের বিকল্প নয়। কোনো বশীকরণ, তাবিজ বা তদবির শাস্ত্রের কোনো অনুশীলন এখানে সুপারিশ করা হচ্ছে না।

আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেন — এই ভালোবাসা লালন করার দায়িত্বটা প্রতিদিনের, শুধু বিয়ের দিনের নয়। (সূরা আর-রূম, আয়াত ২১)

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/newlywed-couple-protection-dua


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ