
বাবা-মায়ের ঝগড়া সন্তানদের সামনে — প্রভাব ও এড়ানোর উপায়
বাবা-মায়ের নিয়মিত ঝগড়া সন্তানের মানসিক বিকাশে গভীর ছাপ ফেলে, যা বয়স অনুযায়ী ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। সন্তানকে সেই প্রভাব থেকে বাঁচাতে বাস্তবিক ও কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক করণীয় বিস্তারিত জানুন।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
রাত সাড়ে দশটায় পাশের ঘরে বাবা-মায়ের গলা উঁচু হতে শুনে ছয় বছরের ফাইজা কাঁথার নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে, দুই হাতে কান চেপে ধরে। পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, "কিছু হয়নি তো।" মা-বাবা ভাবেন, বাচ্চা তো ঘুমিয়ে ছিল, কিছু বোঝেনি। বাস্তবতা হলো, ফাইজা কথার অর্থ না বুঝলেও গলার স্বর, দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, আর সকালের সেই ভারী নীরবতা ঠিকই টের পেয়ে গেছে। কয়েক মাস পর স্কুলের শিক্ষিকা জানান, ফাইজা হঠাৎ করে ক্লাসে চুপচাপ হয়ে গেছে, বন্ধুদের সাথে মিশতে চায় না, ছোট ছোট কারণে কেঁদে ফেলে।
অনেক মা-বাবা মনে করেন সন্তান ছোট, তাই ঝগড়ার সময় দরজা বন্ধ না করলেও তেমন ক্ষতি নেই। বাস্তবতা হলো, শিশুরা শব্দের অর্থ না বুঝলেও ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়ানো চাপা অস্থিরতা টের পায়, আর এই অনুভূতি তাদের শরীরে-মনে জমা হতে থাকে বছরের পর বছর ধরে।
ঝগড়ার প্রভাব যেভাবে সন্তানের মধ্যে থেকে যায়
যেসব সন্তান বারবার বাবা-মায়ের ঝগড়া দেখে বড় হয়, তাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে এর ছাপ পড়ে। বয়স অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াও আলাদা হয়। ছোট শিশুরা প্রায়ই শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখায় — পেটব্যথা, ঘুমের সমস্যা, রাতে বিছানা ভেজানো ফিরে আসা। স্কুলগামী শিশুরা গুটিয়ে যাওয়া স্বভাবের হয়ে ওঠে, কেউ বা স্কুলে বা বন্ধুদের সাথে আচমকা রেগে যায়। কিশোর বয়সের সন্তানরা অনেক সময় নিজেকে দোষী মনে করে, ভাবে হয়তো তার কারণেই সংসারে অশান্তি। কেউ কেউ আবার এমনভাবে বেড়ে ওঠে যে বড় হয়ে নিজের সংসারেও একই প্যাটার্ন বয়ে বেড়ায়, কারণ সম্পর্ক মানেই তর্ক-চিৎকার — এই ধারণাটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘন ঘন উচ্চস্বরে ঝগড়া দেখে বড় হওয়া সন্তানদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে উদ্বেগ ও সম্পর্কভীতি বেশি দেখা যায়, যদিও প্রতিটা শিশুর প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না।
ঘরের পরিবেশ নিয়ে ইসলাম যা বলে
কুরআনে আল্লাহ পরিবারকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার দায়িত্বের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন।
"হে ঈমানদারগণ, নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৬)
এই আয়াতের মূল আলোচনা পরকালের আজাব নিয়ে হলেও, এখান থেকে একটা বড় শিক্ষা পাওয়া যায় — পরিবারকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো একজন মা-বাবার দায়িত্ব, আর সেই ক্ষতি শুধু বাইরের কোনো বিপদ নয়, নিজেদের আচরণও হতে পারে। ঘরের ভেতরে যে অশান্তি তৈরি হয়, সেটাও এক ধরনের ক্ষতি, যেখান থেকে সন্তানকে বাঁচানোর দায়িত্ব বাবা-মায়েরই। এর মানে এই না যে স্বামী-স্ত্রীর মতের অমিল হতেই পারবে না — সেটা অস্বাভাবিক কিছু না, বরং প্রতিটা সংসারেই কমবেশি হয়। পার্থক্য তৈরি হয় কীভাবে সেই মতের অমিল সামলানো হচ্ছে তার মধ্যে।
সন্তানের সামনে যা এড়িয়ে চলা জরুরি
- মতের অমিল হলে সন্তানের সামনে না বলে আলাদা ঘরে বা পরে কথা বলার অভ্যাস করুন
- ঝগড়ার পর সন্তানের সামনে অন্তত স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করুন, যেন সে বুঝতে পারে সংসার ভেঙে যায়নি
- সন্তানকে কোনো পক্ষ নিতে বাধ্য করবেন না, এবং অন্য অভিভাবক সম্পর্কে খারাপ কথা তার সামনে বলবেন না
- সন্তান ঝগড়ার কথা জিজ্ঞেস করলে মিথ্যা আশ্বাস না দিয়ে বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় বলুন যে সমস্যা হয়েছে কিন্তু সমাধানের চেষ্টা চলছে
মতের অমিল মেটানোর দৃশ্যও সন্তানকে দেখানো যায়
একটা বিষয় অনেক অভিভাবক জানেন না — সন্তানের সামনে সব দ্বন্দ্ব সম্পূর্ণ লুকানোর চেয়ে বরং কীভাবে দুজন মানুষ মতের অমিল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মিটমাট করে, তার একটা সুস্থ উদাহরণ সন্তানকে দেখানো অনেক বেশি উপকারী। যদি সন্তানের সামনেই কোনো ছোটখাটো মতের অমিল হয়ে যায়, তাহলে তার সামনেই শান্তভাবে সমাধানে পৌঁছানো এবং একে অপরকে ক্ষমা করে দেওয়ার দৃশ্যও দেখানো যায় — এতে সন্তান শেখে যে দ্বন্দ্ব মানেই সম্পর্কের শেষ নয়, বরং মতের অমিলও শ্রদ্ধার সাথে মেটানো সম্ভব।
ঝগড়ার পর সন্তানের সাথে সম্পর্ক মেরামত
যদি কোনো কারণে সন্তানের সামনেই উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি হয়ে যায়, সেটা লুকানোর চেষ্টা না করে বরং পরে সন্তানকে আশ্বস্ত করাটা জরুরি — "আম্মু-আব্বুর মাঝে একটু মনোমালিন্য হয়েছিল, এখন আমরা ঠিক আছি।" এই ছোট্ট বাক্যটা শিশুর মনে জমে থাকা উদ্বেগ অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। সন্তানের কল্যাণের জন্য নিয়মিত দোয়া করাও একটা গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
রাব্বি ইজআলনি মুক্বিমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিইয়্যাতি, রাব্বানা ওয়া তাক্বাব্বাল দুআ — অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ কায়েমকারী বানাও, এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও, হে আমাদের প্রতিপালক, আমার দোয়া কবুল করো। (সূরা ইব্রাহীম, আয়াত ৪০)
এই দোয়ার পাশাপাশি ঘরে শান্তি ও কল্যাণ কামনায় এই দোয়াও নিয়মিত পড়া যেতে পারে, যা প্রতিদিনের নামাজের পরও পড়ার অভ্যাস করা যায়।
রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাতান ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতান ওয়া ক্বিনা আযাবান নার — অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখিরাতেও কল্যাণ দাও, এবং আমাদের আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করো। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২০১)
যখন ঝগড়া অভ্যাসে পরিণত হয়
মাঝেমধ্যে মনোমালিন্য হওয়া আর প্রতিদিনকার চিৎকার-চেঁচামেচি এক জিনিস না। ঘরে অশান্তি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ালে সেটা শুধু ধৈর্য ধরে সামলে নেওয়ার বিষয় না — এখানে দুজনের মধ্যে গভীর কোনো যোগাযোগের সমস্যা কাজ করতে পারে, যার জন্য পেশাদার কাউন্সেলিং বা পারিবারিক মধ্যস্থতা প্রয়োজন হতে পারে। সন্তানের আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন দেখা গেলে — স্কুলে পড়াশোনায় অমনোযোগ, রাতে দুঃস্বপ্ন, অতিরিক্ত জেদ বা একেবারে চুপচাপ হয়ে যাওয়া — সেটাকে হালকাভাবে না নিয়ে শিশু মনোবিদের পরামর্শ নেওয়াও বিবেচনা করা উচিত। স্কুলের শিক্ষকদের সাথেও যোগাযোগ রাখা ভালো, কারণ ঘরের চেয়ে স্কুলে সন্তানের আচরণ পরিবর্তন অনেক সময় আগে চোখে পড়ে।
বয়সভেদে কথা বলার ভাষা কেমন হবে
প্রি-স্কুল বয়সী শিশুর সাথে কথা বলার সময় খুব সহজ ও সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহার করা উচিত — "আম্মু-আব্বু একটু রাগারাগি করেছিল, এখন ঠিক আছে, তোমাকে ভালোবাসি" জাতীয় আশ্বাস যথেষ্ট। প্রাথমিক স্কুল বয়সী সন্তানরা কিছুটা বেশি প্রশ্ন করতে পারে, তাদের সাথে সততার সাথে কিন্তু বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াই কথা বলা ভালো। কিশোর বয়সী সন্তানরা প্রায়ই পরিস্থিতি অনেকটাই বুঝে ফেলে, তাদের সাথে আরও খোলাখুলি আলোচনা করা যায়, তবে তাদেরও কোনো পক্ষ নিতে বাধ্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিটা বয়সেই মূল বার্তাটা একই থাকা উচিত — সমস্যাটা বাবা-মায়ের মধ্যে, সন্তানের দোষে না।
কখন পেশাদার সাহায্য জরুরি
যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব নিজেদের চেষ্টায় কমানো সম্ভব না হয়, একজন ম্যারিজ কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া উচিত। সন্তানের আচরণে যদি দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, একজন শিশু মনোবিদের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। কিছু পরিবারে ঘরের এই অস্থিরতার সাথে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অহেতুক সন্দেহ বা অস্বাভাবিক রাগের প্রকোপ দেখা গেলে রুকইয়াহর মাধ্যমে সেই দিকটাও পরীক্ষা করে দেখা যায়, তবে এটা পারিবারিক কাউন্সেলিং বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার বিকল্প নয়। আলশিফায় এই ধরনের পারিবারিক পরিস্থিতি নিয়ে বসার জন্য নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ৪৯৯ টাকায় আর জরুরি প্রয়োজনে রাত ৭টা থেকে ১১টার মধ্যে ৯৯৯ টাকায় ওয়েবসাইট থেকে বুক করা যায়। বুকিং কনফার্ম করে বাংলা কিউআর কোডে পেমেন্ট করলে যোগাযোগের নম্বর জানিয়ে দেওয়া হয়।
নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এটা পেশাদার কাউন্সেলিং বা প্রয়োজনে শিশু মনোবিদের বিকল্প নয়। কোনো তাবিজ, বশীকরণ বা তদবির শাস্ত্রের মাধ্যমে সংসারের অশান্তি "সারিয়ে তোলার" কোনো দাবি এখানে করা হচ্ছে না।
সন্তান বড় কথা মনে রাখে না, রাখে ঘরের ভেতরের সেই অনুভূতিটা — নিরাপদ ছিল, নাকি সবসময় দম বন্ধ লাগত।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- স্বামীর রাগের মাথায় তালাক শব্দ বলে ফেলা: করণীয় ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
- প্রবাসফেরত স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিতে না পারা ও স্ত্রীর স্বাধীনতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
- সন্তানেরা বড় হওয়ার পর দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি ও দূরত্ব
- স্বামীর মাদকাসক্তি বা জুয়ার নেশায় সংসার ধ্বংসের মুখে: স্ত্রীর করণীয়
- তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব ও ইসলামি নির্দেশনা
- বারবার গর্ভপাতের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ও মানসিক যন্ত্রণা
https://alshifa.bd/blog/protecting-children-from-parents-conflict