স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব থেকে সুরক্ষা

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব থেকে সুরক্ষা

কর্মক্ষেত্রের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতা, উসকানিদাতা আত্মীয় বা জাদুর ঝুঁকি থেকে সুখী দাম্পত্য জীবন রক্ষার পারিবারিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উপায় — কোরআন-হাদিসভিত্তিক বাস্তব দিকনির্দেশনা।

লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ

রফিক আর শিরিনের বিয়ে তিন বছরের, প্রতিবেশীরা বলত এমন মিল খুব কম দেখা যায়। তারপর অফিসে একটা ট্রেনিং প্রোগ্রামে রফিকের সাথে এক সহকর্মীর ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করল — কাজের কথার আড়ালে টুকটাক ব্যক্তিগত মেসেজ, একসাথে টিফিন খাওয়া, "শুধু বন্ধু" বলে নিজেকে বোঝানো। ঠিক একই সময়ে শিরিনের এক খালা প্রায় প্রতিদিন ফোন করে বলতে শুরু করলেন, "রফিক তোমাকে অবহেলা করে, আমি তো আগেই বুঝেছিলাম।" ছয় মাসের মধ্যে যে সংসারে হাসি লেগে থাকত, সেখানে সন্দেহ, দূরত্ব আর নীরবতা জায়গা করে নিল। কেউ বাইরে থেকে জাদু করেনি, কোনো দৃশ্যমান বিশ্বাসঘাতকতাও ঘটেনি — অথচ বাইরের দুটো প্রভাব মিলে একটা সুস্থ সংসারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিল।

সুখী দাম্পত্য জীবনে বাইরের প্রভাব একটা বাস্তব ঝুঁকি — কখনো হিংসুক আত্মীয়ের উসকানি, কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে চাওয়া কেউ, আবার কখনো সরাসরি জাদুর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে এই বিপদের গভীরতা সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন।

"শয়তান তার সিংহাসন পানির উপর স্থাপন করে, তারপর সে তার বাহিনী পাঠায় মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। তার কাছে সবচেয়ে সম্মানের সে-ই, যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। তাদের একজন এসে বলে, আমি এই কাজ করেছি, ওই কাজ করেছি — শয়তান বলে, তুমি কিছুই করোনি। এরপর একজন এসে বলে, আমি তাকে ছেড়ে দিইনি যতক্ষণ না তার আর তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি — তখন শয়তান তাকে কাছে টেনে নেয় এবং বলে, তুমিই সেরা।" (সহীহ মুসলিম)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট, একটা সুখী সংসার ভাঙা শয়তানের সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটা। তাই এই সুরক্ষাও দৈবক্রমে আসে না, সচেতনভাবে নিতে হয় — আর সেই সুরক্ষার তিনটা দিক আছে, পারিবারিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক।

পারিবারিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা

প্রতিটা যৌথ পরিবারেই কারো না কারো মন্তব্য দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করে — কখনো ভালোবাসা থেকে, কখনো ঈর্ষা থেকে। শিরিনের খালার মতো মানুষ প্রায়ই নিজের অতীত অভিজ্ঞতা বা হতাশা থেকে অন্যের সংসারে সন্দেহ বপন করেন, নিজের অজান্তেই। দাম্পত্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিজেদের মধ্যে সরাসরি ও খোলামেলা যোগাযোগে নিন — তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বার্তা চালাচালি যত কমাবেন, ভুল বোঝাবুঝির সুযোগও তত কমবে। সমস্যা সত্যিই গুরুতর হয়ে উঠলে কুরআন এর জন্য একটা নির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছে।

"যদি তোমরা তাদের দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তাহলে পুরুষের পরিবার থেকে একজন এবং নারীর পরিবার থেকে একজন সালিশকারী নিযুক্ত করো। তারা যদি মিলমিশ চায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৫)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আয়াতে নিরপেক্ষ, দুই পরিবার থেকে একজন করে সালিশকারীর কথা বলা হয়েছে — যে কেউ একজন উসকানিদাতা আত্মীয় নয়। যে আত্মীয় শুধু একপক্ষের কথা শুনে আগুনে ঘি ঢালেন, তাকে সালিশকারী না বানিয়ে বরং বিনয়ের সাথে দূরত্ব রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

বহিরাগত আকর্ষণ থেকে সুরক্ষা

কর্মক্ষেত্র, প্রশিক্ষণ, বা সামাজিক মাধ্যমে অপরিচিত বা পরিচিত কারো সাথে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা প্রায়ই এমনভাবে শুরু হয় যে নিজেরাই বুঝতে পারেন না কখন সীমা পার হয়ে গেছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কতা দিয়েছেন।

"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একাকী অবস্থান করলে, তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত থাকে।" (সুনানে তিরমিযি)

এই হাদিস কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সন্দেহ করার জন্য নয়, বরং একটা কাঠামোগত সতর্কতা — কাজের প্রয়োজনে বিপরীত লিঙ্গের সাথে যোগাযোগ হতেই পারে, কিন্তু সেই যোগাযোগ যেন পেশাদারিত্বের সীমার মধ্যে থাকে, একা একা দীর্ঘ সময় কাটানো বা ব্যক্তিগত আবেগ শেয়ার করার দিকে না গড়ায়। সঙ্গীর সাথে নিয়মিত মানসম্পন্ন সময় কাটানোটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ — সম্পর্কে যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেটাই অন্য কেউ পূরণ করার সুযোগ পায়। ছোট ছোট প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস এই শূন্যতা তৈরি হতেই দেয় না।

যে অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে সংসারে ফাটল ধরায়

  • সঙ্গীকে না জানিয়ে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে দীর্ঘ ব্যক্তিগত কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া
  • ঘরের সমস্যা বাইরের কারো কাছে গিয়ে সহানুভূতি খোঁজা, সঙ্গীর সাথে সরাসরি আলোচনা এড়িয়ে
  • মেসেজ বা কল হিস্ট্রি লুকিয়ে রাখার প্রবণতা তৈরি হওয়া
  • একপাক্ষিক আত্মীয়ের কথায় বারবার প্রভাবিত হয়ে সঙ্গীর প্রতি সন্দেহ পোষণ করা

সামাজিক মাধ্যমের ঝুঁকি

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রামে পুরনো পরিচিত কারো সাথে আবার যোগাযোগ শুরু হওয়া, স্কুল-কলেজের বন্ধুর সাথে "শুধু খোঁজখবর নেওয়া" থেকে ধীরে ধীরে গভীর ব্যক্তিগত কথোপকথনে গড়ানো — এই প্যাটার্ন এখনকার সময়ে সংসার ভাঙার অন্যতম সাধারণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমস্যাটা হলো, এই যোগাযোগ এত ধীরে ধীরে গভীর হয় যে জড়িত মানুষটা নিজেও বুঝতে পারেন না কখন সীমা পার হয়ে গেছেন। রাতে সঙ্গী ঘুমিয়ে পড়ার পর মোবাইলে চ্যাট করা, নির্দিষ্ট কারো মেসেজ এলে মুখে হাসি ফুটে ওঠা, সেই মেসেজ সঙ্গীর থেকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা — এই ছোট ছোট লক্ষণগুলোই আসলে বড় বিপদের প্রথম সংকেত। সচেতন দম্পতিরা একে অপরের সাথে ডিজিটাল স্বচ্ছতা বজায় রাখেন — কারো ফোন গোপন রাখার প্রয়োজন হয় না, কারণ লুকানোর কিছু থাকে না।

আধ্যাত্মিক সুরক্ষা

উভয়ে সকাল-সন্ধ্যা মু'আউবিযাতাইন ও আয়াতুল কুরসি পাঠ করুন, আর নিয়মিত একসাথে সংসারের জন্য দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিইয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিন ওয়াজআলনা লিলমুত্তাক্বীনা ইমামা — অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করো, আর আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানাও। (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪)

এছাড়া নিজের মনে অহেতুক অস্থিরতা বা বাইরের কারো প্রতি অস্বাভাবিক টান অনুভব করলে এই দোয়া পড়া যেতে পারে।

আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক্ব — অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্যসমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইছি। (সহীহ মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ঘরে সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াত হয়, সেই ঘরে শয়তান প্রবেশ করে না (সহীহ মুসলিম) — তাই ঘরে নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের পরিবেশ রাখা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, সংসার সুরক্ষারও একটা উপায়।

সতর্কতার লক্ষণ চিহ্নিত করা

যদি হঠাৎ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার পরপরই সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে — বিশেষ করে ধীরে ধীরে নয়, বরং হঠাৎ ও ব্যাখ্যাতীতভাবে — তা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন। সন্দেহের বশে সরাসরি অভিযোগ না করে শান্তভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করুন, প্রয়োজনে বিনয়ের সাথে সেই সংস্পর্শ সীমিত করার কথা বলুন। একই সাথে, উসকানিদাতা আত্মীয়ের কথায় কান দেওয়ার আগে নিজেরা সরাসরি কথা বলে বিষয়টা যাচাই করে নিন। মনে রাখা জরুরি, একবার সন্দেহ প্রকাশ করলেই যে তা সত্য প্রমাণিত হয়ে যাবে এমন না — উদ্বেগ প্রকাশ করাটা অভিযোগ করার মতো তীব্র হওয়ার দরকার নেই, বরং কৌতূহল ও যত্নের সুরে বিষয়টা তুলে ধরাই বেশি কার্যকর।

কখন পেশাদার সাহায্য প্রয়োজন

যদি বাইরের প্রভাব বা পারিবারিক হস্তক্ষেপ এতটাই গভীর হয়ে যায় যে নিজেরা বসে সমাধান করতে পারছেন না, তাহলে একজন ম্যারিজ কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া লজ্জার কিছু নয়। কোনো সম্পর্ক আইনি জটিলতার দিকে গড়ালে একজন আইনজীবীর পরামর্শও প্রয়োজন হতে পারে। আর যদি মনে হয় পরিস্থিতির মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু আছে — ব্যাখ্যাতীত ঘৃণা, হঠাৎ আকর্ষণ বা বিতৃষ্ণা যার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না — তখন রুকইয়াহর মাধ্যমে সেই দিকটা যাচাই করে দেখা যেতে পারে, তবে এটাকে সমস্যার একমাত্র বা নিশ্চিত সমাধান ভাবা ঠিক না। আল-শিফায় এই বিষয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া যায় ওয়েবসাইট থেকে, নিয়মিত ফি ৪৯৯ টাকা, জরুরি প্রয়োজনে রাত ৭টা থেকে ১১টার মধ্যে ৯৯৯ টাকায়।

নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এখানে দেওয়া পরামর্শ পেশাদার কাউন্সেলিং বা আইনি পরামর্শের বিকল্প নয়। কোনো বশীকরণ, পাল্টা জাদু, তাবিজ বা তদবির শাস্ত্রের বই থেকে নেওয়া কোনো আমল এখানে সুপারিশ করা হচ্ছে না।

সুখী সংসার আল্লাহর একটা বড় নিয়ামত — এর যত্ন নেওয়াটা শুধু আবেগের বিষয় না, প্রতিদিনের সচেতন সিদ্ধান্তেরও বিষয়।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স

আরও পড়ুন

https://alshifa.bd/blog/protecting-marriage-from-outside-influence


নিরাময় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। রুকইয়াহ চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শও নিন।

© আল-শিফা · alshifa.bd · ফেসবুক পেজ