
দ্বিতীয় বিয়ে ও সতীনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সামলানোর উপায়
দ্বিতীয় বিয়ের পর সতীনদের মধ্যে ঈর্ষা ও দ্বন্দ্ব কেন হয়, সূরা আন-নিসার ন্যায়বিচারের শর্ত ইসলাম কী বলে, আর বাস্তবে এই সংঘাত কমাতে কী করা যায় তার বিস্তারিত আলোচনা।
লিখেছেন হযরত মাওলানা আল আমিন · প্রকাশ · হালনাগাদ
এক ঘরে দুই স্ত্রী, অথচ মন খারাপের কারণ প্রায় সময় একই — কে বেশি সময় পাচ্ছে, কার সন্তান বেশি আদর পাচ্ছে, কার জন্য ঈদে কী কেনা হলো। রাশিদা যখন জানতে পারলেন স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, প্রথম কয়েক সপ্তাহ তার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটাই থমকে গেছে। এরপর যখন দুই সংসার একই মহল্লায় চলতে শুরু করল, প্রতিটা ঈদে কে কী উপহার পেল তার হিসাব, প্রতিটা রাতে স্বামী কোথায় থাকবেন তার হিসাব — সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন একটা নিরন্তর প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত হলো। দ্বিতীয় বিয়ের পর সংসারে যে টানাপোড়েন শুরু হয়, তার পেছনে বেশিরভাগ সময় থাকে এই তুলনা আর নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি।
ন্যায়বিচারের শর্তেই একাধিক বিয়ের অনুমতি
কুরআনে একাধিক বিয়ের অনুমতি নিঃশর্ত নয়। সূরা আন-নিসার তৃতীয় আয়াতে একটা স্পষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
"তোমরা নারীদের মধ্য থেকে যাকে ভালো লাগে দুই, তিন বা চারজন পর্যন্ত বিয়ে করতে পারো, কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকেই বিয়ে করো।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩)
অর্থাৎ একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সময়, অর্থ আর ব্যবহারে সমান আচরণ বজায় রাখা স্বামীর জন্য শর্ত হিসেবে এসেছে, ঐচ্ছিক কোনো ভালো গুণ হিসেবে না। এই ন্যায়বিচার ঠিকমতো বজায় না থাকলেই সতীনদের মধ্যে দ্বন্দ্বের বেশিরভাগ কারণ তৈরি হয়।
দ্বন্দ্ব কোথা থেকে শুরু হয়
বাস্তবে দেখা যায়, সমস্যাটা শুধু স্বামীর অবহেলা থেকেই আসে না। শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যরাও অনেক সময় দুই পক্ষকে উসকে দেন — কাকে বেশি সম্মান দেওয়া হচ্ছে, কার সন্তান পরিবারে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, এসব নিয়ে টিকা-টিপ্পনী চলতেই থাকে। কখনো আবার একজন স্ত্রী নিজেই ধরে নেন যে অন্যজন তার জায়গা কেড়ে নিয়েছে, আর সেই ধারণা থেকেই প্রতিদিনের সম্পর্কটা তিক্ত হতে থাকে। এই অনুভূতিগুলো অস্বাভাবিক না — কারো ভাগের ভালোবাসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা মানুষের খুব স্বাভাবিক একটা প্রতিক্রিয়া, এটাকে খারাপ চরিত্র বলে দাগিয়ে দেওয়ার দরকার নেই।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে স্বাভাবিক ঈর্ষার ঘটনা হাদিসে এসেছে, এবং তিনি সেটাকে মানবিক বাস্তবতা হিসেবেই গ্রহণ করতেন। তবে একটা বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধ এসেছে — কোনো নারীকে অন্য নারীর সংসার ভাঙতে চাওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ।
"কোনো নারী যেন তার (দ্বীনি) বোনের তালাক কামনা না করে, যাতে তার পাত্রের জায়গাটা নিজে দখল করতে পারে।" (সহীহ বুখারী)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম একজন নারীর অধিকারকে সম্মান দেয়, অন্য নারীকে ঠেলে সরিয়ে নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টাকে না।
যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাত হয়
- স্বামীর সময় ও রাত্রিযাপনের ভাগাভাগি নিয়ে অসন্তোষ
- সন্তানদের মধ্যে খরচ, উপহার বা শিক্ষার সুযোগে বৈষম্যের অভিযোগ
- শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের একপক্ষকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া
- সামাজিক অনুষ্ঠানে কাকে আগে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বা কার নাম আগে বলা হচ্ছে তা নিয়ে সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা
স্বামীর দায়িত্ব — ন্যায়বিচার শুধু কথায় না, বাস্তবে
দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত যিনি নেন, ন্যায়বিচার বজায় রাখার মূল দায়িত্বটাও তারই। এই দায়িত্ব শুধু রাত্রিযাপনের পালা মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না — খরচ, উপহার, সময়, এমনকি কথা বলার সুরেও সমতা রাখা জরুরি। অনেক স্বামী মনে করেন মনের ভেতরে একজনকে বেশি ভালোবাসলেও বাহ্যিক আচরণে সমতা রাখলেই দায়িত্ব পালন হয়ে যায় — এই বোঝাপড়াটা মূলত সঠিক, কারণ ইসলাম হৃদয়ের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে বলে না, কিন্তু আচরণ ও সময়ের বণ্টনে ন্যায়বিচার আবশ্যক করে। যে স্বামী একজন স্ত্রীর অভিযোগ শুনে অন্যজনের পক্ষ নিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দেন, বা একজনের কথা শোনার আগেই আরেকজনকে সঠিক ধরে নেন, তিনি এই দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছেন। দুই স্ত্রীর প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদা সময়ে বসে তাদের অভিযোগ ও অনুভূতি শোনা, এবং প্রয়োজনে নিজের আচরণ সংশোধন করার মানসিকতা রাখাটাই একজন ন্যায়পরায়ণ স্বামীর লক্ষণ।
বাস্তবে কী করা যেতে পারে
- স্বামীর সাথে সরাসরি, অভিযোগের সুরে না গিয়ে নিজের অনুভূতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলুন
- অন্য স্ত্রী বা তার সন্তানের সাথে তুলনা করে নিজেকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন, যদিও এটা সহজ না
- পরিবারের অন্য সদস্যদের উসকানিমূলক কথা থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখুন
- নিজের অধিকার নিয়ে জানুন, এবং প্রয়োজনে সরাসরি স্বামীর কাছে ন্যায়বিচারের কথা তুলুন, চাপা ক্ষোভ জমিয়ে না রেখে
ঈর্ষা ও অন্তরের অস্থিরতা কমাতে এই দোয়া নিয়মিত পড়া যেতে পারে, যা মুহাজির সাহাবীদের জন্য নাযিলকৃত একটা দোয়া, যেখানে বিশ্বাসীদের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ না রাখার আকুতি জানানো হয়েছে।
রাব্বানা লা তাজআল ফি কুলুবিনা গিল্লাল লিল্লাযিনা আমানু, রাব্বানা ইন্নাকা রাউফুর রাহিম — অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, যারা ঈমান এনেছে তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না, হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় তুমি অত্যন্ত স্নেহশীল, দয়ালু। (সূরা আল-হাশর, আয়াত ১০)
মানসিক চাপ কমাতে ও ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামলাতে মুসা আলাইহিস সালামের এই দোয়াও সহায়ক হতে পারে।
রাব্বি ইশরাহ লি সাদরি ওয়া ইয়াসসির লি আমরি — অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও, আর আমার কাজ সহজ করে দাও। (সূরা ত্বাহা, আয়াত ২৫-২৬)
ঈর্ষা কখন গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়
কখনো কখনো এই ঈর্ষা আর অস্থিরতা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে ঘুম হয় না, সারাক্ষণ সন্দেহ কাজ করে, বা মনে হয় কেউ যেন জাদু-টোনা করে সংসারটা নষ্ট করে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় প্রথমেই কাউকে দোষারোপ না করে বিষয়টা যাচাই করে দেখা জরুরি, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা মানুষের স্বাভাবিক অনিরাপত্তাবোধ, কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ ছাড়াই।
সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য এড়ানো
দুই সংসারের সন্তানরা বড় হওয়ার সাথে সাথে একে অপরের সাথে তুলনা শুরু করে, আর এই তুলনার বীজ প্রায়ই বপন হয় বড়দের আচরণ থেকেই। শিক্ষার সুযোগ, ঈদের পোশাক, পড়াশোনার খরচ — এসব ক্ষেত্রে স্বামীর সচেতন সমতা বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি দুই মায়েরও উচিত নিজের সন্তানের সামনে অন্য সন্তান সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য থেকে বিরত থাকা। সন্তানরা যদি ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে ভাইবোন হিসেবে বড় হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে বড় হয়ে পারিবারিক সম্পর্ক অনেক বেশি সুস্থ থাকে।
কখন পেশাদার সাহায্য জরুরি
দীর্ঘদিন ধরে এই জটিলতা চলতে থাকলে পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়া একটা বাস্তবসম্মত বিকল্প, বিশেষ করে যদি স্বামী ন্যায়বিচার বজায় রাখতে ব্যর্থ হন এবং তা নিয়ে সরাসরি আলোচনায়ও সমাধান না আসে। যদি মনে হয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ঈর্ষার চেয়ে বেশি কিছু, রুকইয়াহর মাধ্যমে সেই দিকটা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। আলশিফায় নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ৪৯৯ টাকা, জরুরি ভিত্তিতে রাত ৭টা থেকে ১১টার মধ্যে ৯৯৯ টাকায় ওয়েবসাইট থেকেই বুক করা যায়, আর বাংলা কিউআর কোডে পেমেন্ট নিশ্চিত হলে যোগাযোগের নম্বর পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
নিরাময় ও সমাধান একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এখানে দেওয়া পরামর্শ পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের বিকল্প নয়। কোনো তাবিজ, বশীকরণ বা তদবির শাস্ত্রের মাধ্যমে সতীনের মন পরিবর্তন বা স্বামীর মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের কোনো দাবি এখানে করা হচ্ছে না।
ন্যায়বিচার যেখানে থাকে, সেখানে দুই স্ত্রীর মধ্যেও শান্তি সম্ভব — অভাবটা থাকে সমতায়, সংখ্যায় না।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন · রুকইয়াহ শারইয়্যাহ সার্টিফিকেট কোর্স
আরও পড়ুন
- স্বামীর রাগের মাথায় তালাক শব্দ বলে ফেলা: করণীয় ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
- প্রবাসফেরত স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিতে না পারা ও স্ত্রীর স্বাধীনতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
- সন্তানেরা বড় হওয়ার পর দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি ও দূরত্ব
- স্বামীর মাদকাসক্তি বা জুয়ার নেশায় সংসার ধ্বংসের মুখে: স্ত্রীর করণীয়
- তালাকের পর সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব ও ইসলামি নির্দেশনা
- বারবার গর্ভপাতের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ও মানসিক যন্ত্রণা